|
| |
শনিবার, ০৭ নভেম্বর, ২০২৬, ২২ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

স্বত্ব © ২০২৬ গণমাধ্যম। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।

সর্বশেষঃ

প্রতিটি মানুষ একেকটা মাটির প্রদীপ

গণমাধ্যম ডেক্স

গণমাধ্যম ডেক্স

প্রকাশ : ০৭ নভেম্বর, ২০২৬, ০৫:৪৫ এএম
৩৬৬ পঠিত
প্রতিটি মানুষ একেকটা মাটির প্রদীপ
যুক্ত থাকুন
সর্বশেষ খবরের জন্য ফলো করুন:
এক অভিভাবক বলে উঠলেন, ‘জাইল্লার ফোয়া কেনে ফাস্ট ওইয়ে?’ এই যে অপমান, এটা তো অবধারিত। এটাই আমাকে আরও পড়তে, আরও সামনে যেতে সাহায্য করেছে।

হরিশংকর জলদাস বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক। ১৯৫৫ সালের ১২ অক্টোবর চট্টগ্রামের উত্তর পতেঙ্গার এক জেলেপল্লিতে জন্ম। তাঁর ‘জলপুত্র’, ‘দহনকাল’ ও ‘নোনাজলে ডুবসাঁতার’ ইত্যাদি উপন্যাসে জেলেজীবনের দুঃখ, বঞ্চনা, সংগ্রামের কথা উঠে এসেছে। বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, প্রথম আলো বর্ষসেরা বই পুরস্কার ও একুশে পদকসহ নানা সম্মাননা পেয়েছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আহমেদ মুনির

আপনার জন্ম ও বেড়ে ওঠা উত্তর পতেঙ্গার জেলেপল্লিতে। সেখানে আপনিই সম্ভবত স্কুলে পড়া প্রথম শিশু। লেখাপড়া করতে গিয়ে কি বাধার সম্মুখীন হয়েছিলেন?

হরিশংকর জলদাস: জেলেপল্লিতে আগামী দিন কীভাবে খাবার জুটবে, সেই ভাবনা ভাবতে হয় সব সময়। টেকনাফ থেকে হাতিয়া পর্যন্ত জেলেসমাজের কোথাও পড়াশোনা জানা লোক ছিলেন না। সেখানে আমি পড়াশোনা করেছি প্রধানত বাবার জেদের কারণে। বাবা যুধিষ্ঠির জলদাস নিজেও ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত পড়েছেন। এর বেশি পড়তে পারেননি। বাবার যখন আড়াই বছর বয়স, তখন দাদা চন্দ্রমণি জলদাস মাছ ধরতে সাগরে গিয়ে ঝড়ের কবলে পড়ে নৌকা ডুবে মারা যান। তখন ঠাকুরদি পরানেশ্বরীর বয়স মাত্র ১৯ বছর। ওই বয়সে তিনি ঝাঁকা মাথায় করে মাছ বিক্রি শুরু করেন। বাবা এটা মানতে পারেননি। সমুদ্রের প্রতি তাঁর ভীষণ রাগ জন্মায়। জেলেপল্লিতে আমাদের বাড়ির পশ্চিমে সমুদ্র। তিনি বলতেন, আমি ছেলেমেয়েকে পশ্চিমে পাঠাব না। অর্থাৎ সমুদ্রে পাঠাবেন না।

শিক্ষা আপনাদের জীবন পাল্টে দিল?

হরিশংকর জলদাস: আমরা ছিলাম ছয় ভাই ও দুই বোনের বড় পরিবার। অনেক জেলে পরিবারে ১৭টি ছেলেমেয়েও ছিল। জেলেরা বেশি সন্তান নিতেন কেবল মাছ ধরার লোক বাড়ানোর প্রয়োজনে। বাবা সাগরে ছেলেদের নেবেন না ঠিক করলেও ঐতিহ্য অনুযায়ী তিনিও আট সন্তানের পিতা হলেন। এত বড় সংসার, ১১ জন মানুষ। তাঁর একার পক্ষে সবার খাবার জোগাড় করা ছিল অসম্ভব বিষয়। তাই ১১-১২ বছর বয়স থেকে তাঁকে সাহায্য করতে আমি সাগরে যেতে শুরু করলাম। তখন আমরা বইঠা বাওয়া নৌকায় সাগরের দুই–তিন কিলোমিটার গভীরে জাল ফেলে মাছ ধরতাম। মাছ ধরা শেষে ঠাকুরদির সঙ্গে মাছ বিক্রি করতে যেতাম। এর মধ্যে আমার স্কুলে যাওয়া শুরু। পতেঙ্গার যে স্কুলে পড়তাম, সেখানে বেশির ভাগই ছিল হিন্দুপাড়ার ছাত্রছাত্রী। মনে আছে, ক্লাস ফাইভে রেজাল্ট দেওয়ার দিন ঠাকুরদি মাছের ঝাঁকা নিয়ে স্কুলে হাজির হয়েছিলেন। একটা গাছের নিচে হেলান দিয়ে বসে তিনি দেখছিলেন, হেডমাস্টার রেজাল্ট ঘোষণা করছেন। একসময় ঘোষণা এল ‘হরিশংকর জলদাস প্রথম হয়েছে।’ তখনই এক অভিভাবক বলে উঠলেন, ‘জাইল্লার ফোয়া কেনে ফাস্ট ওইয়ে?’ এই যে অপমান, এটা তো অবধারিত। এটাই আমাকে আরও পড়তে, আরও সামনে যেতে সাহায্য করেছে। সেদিন এ কথা শুনে মনে হলো আমাকে পড়তেই হবে। ম্যাট্রিক পাস করতে হবে।

জেলেপল্লিতে আমাদের বাড়ির পশ্চিমে সমুদ্র। তিনি বলতেন, আমি ছেলেমেয়েকে পশ্চিমে পাঠাব না। অর্থাৎ সমুদ্রে পাঠাবেন না।

আপনি উচ্চশিক্ষা নিয়েছেন, গবেষণা করেছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রি অর্জন করেছেন, পরে অধ্যাপনাও করেছেন। কিন্তু এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, আপনি শিক্ষকতা করার সময়েও রাতে নিয়মিত মাছ ধরতে যেতেন। 

হরিশংকর জলদাস: আগেই বলেছি, সংসারে ১১ জন সদস্য। আট ভাইবোন আমরা। জীবনের বহু বছর পর্যন্ত পেট ভরে ভাত খাওয়ার যে স্বস্তি, তা অনুভব করতে পারিনি। ১৯৭৪-৭৫ সালের কথা। দেশে তখন চরম খাদ্যাভাব। আমাদের পুকুরপাড়ে এমনিতেই কলমি আর হেলেঞ্চার শাক হতো। সেটাই সেরখানেক তুলে আনতেন মা। প্লেটভর্তি শাকের সঙ্গে অল্প ভাত খেতে পেতাম। আমি যখন কলেজে শিক্ষকতা শুরু করি, তখনো পরিস্থিতি খুব বদলায়নি। ভাইবোনেরা ছোট, লেখাপড়া করে। বড় ছেলে হিসেবে বাবার সঙ্গে আমিই মাছ ধরতে যাই। কখনো কখনো সারা রাত মাছ ধরে সকালে স্নান করে কলেজে গিয়েছি।

আপনি যখন লেখালেখি শুরু করেন, তখন আর একেবারে তরুণ নন। একজন কৈবর্ত কী করে বাংলা সাহিত্যের অগ্রগণ্য লেখক হয়ে উঠল?

হরিশংকর জলদাস: চট্টগ্রামের বিখ্যাত কমিউনিস্ট নেতা আহসাব উদ্দিন আহমদের জন্মভিটা দেখতে বাঁশখালী গিয়েছিলাম একবার। সেখানে তাঁদের এক বয়স্ক আত্মীয়র দেউড়ি ঘরে বসেছি। আলাপ হচ্ছিল সাম্প্রতিক বন্যা নিয়ে। সে বন্যায় ওই এলাকার বেশ কিছু মানুষ মারা গিয়েছিলেন। ওই বয়স্ক ব্যক্তিটি সে বিবরণ দিতে গিয়ে বললেন, ‘আঁরার এলাকার ১০ জন মানুষ আর ৩ জন ডোম মারা গিইয়ে।’ নদীর অপর পাড়ের মানুষ তখন জেলেদের ডোম বলত। জাইল্লা শব্দটির চেয়ে ডোম অনেক তাচ্ছিল্যপূর্ণ শব্দ। নিম্নবর্গের মানুষদের লোকে এই চোখেই দেখত। তারা মানুষ হিসেবেই গণ্য হতো না। এটা শুনতে আমি অভ্যস্তই ছিলাম। 

কলেজে পড়ানো শুরু করার পর এক নারী প্রিন্সিপাল জাইল্লা বলে সম্বোধন করতেন পেছনে। বলতেন, ‘জাইল্লার ছেলেটা ক্লাস নিতে গেছে?’ এই অপমান কী কারণে, তা জানতে ইচ্ছে হতো। মনে হতো, জেলে সম্প্রদায় আসলেই কি কোনো অন্যায় করেছে? সেই ভাবনা থেকেই ‘বাংলা উপন্যাসে কৈবর্তজীবন’ নিয়ে পিএইডি শুরু করি। গবেষণা শুরুর পর দেখতে পেলাম, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পদ্মা নদীর মাঝি, সমরেশ বসুর , ঘনশ্যাম চক্রবর্তীর অবগাহন উপন্যাসে জেলেজীবন বলে যা দেখানো হয়েছে, তা প্রকৃত চিত্র নয়। অদ্বৈত মল্লবর্মণের তিতাস একটি নদীর নাম উপন্যাস বরং অনেক বাস্তবানুগ। ভাবলাম, নিজের অভিজ্ঞতা থেকে আমিও লিখব। সেভাবেই লিখতে শুরু করি। বলা যায়, অপমান আর গ্লানিই আমাকে দিয়ে লিখিয়ে নিল।

আমি যখন রামগোলাম উপন্যাস লিখছিলাম, তখন হরিজন সম্প্রদায়ের কলোনিগুলোতে গিয়েছি। সেখানে অনেক মেধাবী শিক্ষার্থীর দেখা পেয়েছি। কিন্তু তাদের পেছনে কেউ নেই। তারা পারবে, এই বিশ্বাসটা কেউ তাদের দেয়নি’

আপনি দেশের অগ্রগণ্য লেখক। সাহিত্যকীর্তির জন্য নানা সম্মাননা পেয়েছেন। এমন সাফল্যের পরেও অতীতের কোনো ক্ষত কি জেগে ওঠে?

হরিশংকর জলদাস: জলপুত্র প্রকাশের পর কিন্তু আমার কোনো খ্যাতি ছিল না। দহনকাল প্রকাশিত হওয়ার পর ‘প্রথম আলো বর্ষসেরা পুরস্কার’ পেয়ে আমি রাতারাতি সাহিত্যিক খ্যাতি পেয়ে যাই। এর বাইরে আমার অতীত ও বর্তমান নিয়ে আমি এখনো সাধারণ একজন মানুষ। নোনাজলে ডুবসাঁতার আমার জেলেজীবনের আত্মকথা। সেখানে আমি সব কথাই খোলাখুলি বলেছি। এক শিক্ষক আমাকে যৌন নিপীড়ন করতে চাইতেন, সে কথাও অবলীলায় বলেছি। এমন অনেক স্মৃতি আছে।

আমি যখন কলেজে শিক্ষকতা শুরু করি, তখনো পরিস্থিতি খুব বদলায়নি। ভাইবোনেরা ছোট, লেখাপড়া করে। বড় ছেলে হিসেবে বাবার সঙ্গে আমিই মাছ ধরতে যাই। কখনো কখনো সারা রাত মাছ ধরে সকালে স্নান করে কলেজে গিয়েছি।

কোন বিশ্বাস থেকে মানুষ প্রতিকূলতা ছাপিয়ে নিজের পায়ের নিচে মাটি খুঁজে পায়, কীভাবেই বা উঠে আসে বাধা ডিঙিয়ে, আপনার অভিজ্ঞতা থেকে বলুন।

হরিশংকর জলদাস: জেলেপল্লি, চা-বাগান কিংবা হরিজন সম্প্রদায়ের ছোট ছোট পল্লি থেকে অনেকেই লেখাপড়া শিখে সমাজে প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন। উঠে আসা প্রতিটি মানুষের জীবনই একেকটা উপন্যাস। আমি যখন রামগোলাম উপন্যাস লিখছিলাম, তখন হরিজন সম্প্রদায়ের কলোনিগুলোতে গিয়েছি। সেখানে অনেক মেধাবী শিক্ষার্থীর দেখা পেয়েছি। কিন্তু তাদের পেছনে কেউ নেই। তারা পারবে, এই বিশ্বাসটা কেউ তাদের দেয়নি।

জেলেপল্লিতে আমি এখন যখন যাই, বয়স্ক মানুষজন আমার সঙ্গে সহজভাবে মেশেন, কথা বলেন। তাঁরা অনেকেই আমার মাছ ধরার সঙ্গীসাথি। কিন্তু যারা তরুণ, তারা ভয় পায়, দূরত্ব রাখে। তারা ভাবে, আমার কাছাকাছিও তারা নেই। তারাও যে সমান, এই বিশ্বাস তাদের নেই। আসলে প্রতিটি মানুষ একেকটা মাটির প্রদীপ। সবার
মধ্যে সলতে আছে। সেখানে আগুন জ্বললেই আর কেউ দমাতে পারে না। আমার বাবা যুধিষ্ঠির জলদাস তাঁর সন্তানদের সলতের মধ্যে আগুন দিয়েছিলেন। তাই আমরা পেরেছি। আমরা সব ভাইবোন লেখাপড়া শেষ করেছি। এটা সম্ভব যদি আগুনটা কেউ জ্বালিয়ে দেয়।

জেলেপল্লিতে আমি এখন যখন যাই, বয়স্ক মানুষজন আমার সঙ্গে সহজভাবে মেশেন, কথা বলেন। তাঁরা অনেকেই আমার মাছ ধরার সঙ্গীসাথি। কিন্তু যারা তরুণ, তারা ভয় পায়, দূরত্ব রাখে। তারা ভাবে, আমার কাছাকাছিও তারা নেই।

সূত্র: প্রথম আলো