|
| |
বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর, ২০২৬, ২০ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

স্বত্ব © ২০২৬ গণমাধ্যম। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।

সর্বশেষঃ

বড় বাজার ঘিরেই চলছে খুলনার ব্যবসা

গণমাধ্যম ডেক্স

গণমাধ্যম ডেক্স

প্রকাশ : ০৫ নভেম্বর, ২০২৬, ০৪:৫৮ এএম
৩৬০ পঠিত
বড় বাজার ঘিরেই চলছে খুলনার ব্যবসা
যুক্ত থাকুন
সর্বশেষ খবরের জন্য ফলো করুন:
এ বাজারে ২৫ কোটি টাকার দৈনিক লেনদেন হয়। বাজারে বিক্রি হওয়া শত শত পণ্যের মধ্যে অর্ধেক ব্যবসা চাল ও মসলার।
ভৈরব নদের তীরে খুলনার বড় বাজার

ভোর থেকেই খুলনার ভৈরব নদের তীরে শুরু হয় ব্যবসায়ীদের কর্মব্যস্ততা। ঠেলাগাড়ি, ভ্যান আর রিকশার জটলায় ওয়েস্ট মেকট রোডের মতো সরু সড়কগুলোর অর্ধেকটাই দখল হয়ে থাকে সারি সারি দোকানের মালপত্রে। কুলিদের হাঁকডাক আর ক্রেতা-বিক্রেতার দর–কষাকষিতে মুখর হয়ে ওঠে চারপাশ। একসময় ভৈরব নদের পাড়ে যেখানে দিনরাত মালবাহী নৌপরিবহনের সারি লেগে থাকত, সেখানে এখন তা হাতে গোনা। রেলের বগি ভর্তি করে পণ্য আসার পুরোনো দৃশ্যও প্রায় হারিয়ে যাচ্ছে। এখন সড়কপথে ট্রাকেই সিংহভাগ মালামাল পরিবহন হচ্ছে। পরিবহন আর যোগাযোগব্যবস্থার এই বাঁকবদলের দৃশ্যপটই বলে দেয়, এ অঞ্চলের বাণিজ্যের অন্যতম প্রাণকেন্দ্র—ঐতিহ্যবাহী ‘বড় বাজার’। আগের জৌলুশে খানিকটা ভাটা পড়লেও এখনো দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সবচেয়ে বড় পাইকারি বাজার হিসেবে টিকে আছে প্রাচীন এই বাণিজ্যকেন্দ্র।

বেশি বাণিজ্য চাল ও মসলার

খুলনার এই প্রাচীন বড় বাজারে বেশি বাণিজ্য হয় প্রধান খাদ্যপণ্য চাল ও মসলার। খুলনা ধান-চাল বণিক সমিতি ও খুলনা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক সভাপতি মো. মুনীর আহমেদ বাজারের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে প্রথম আলোকে বলেন, ‘এখানে সবচেয়ে বেশি বাণিজ্য হয় চাল ও মসলার। যদিও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ব্যবসার পরিমাণ আগের তুলনায় কমেছে, তবু এখনো বাজারের মোট বাণিজ্যের অর্ধেকটাই হচ্ছে চাল ও মসলা।’

খুলনা সিটি করপোরেশনের (কেসিসি) কর্মকর্তারা জানান, একসময় এ বাজারের মাসিক লেনদেন এক হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেত, তা এখন ৬৫০ থেকে ৭৫০ কোটি টাকা। বর্তমানে দৈনিক লেনদেন হয় ২০ থেকে ২৫ কোটি টাকা। এ হিসাবে বার্ষিক ৯ হাজার কোটি টাকার বেশি বাণিজ্য হয়।

চালের মোকাম

বড় বাজারের চালের পাইকারি মোকামগুলোতে চাল আসে কুষ্টিয়া, ফরিদপুর, শরীয়তপুর, টাঙ্গাইল, রংপুর, রাজশাহীসহ দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে। ওয়েস্ট মেকট রোডের দুই ধারে সারি সারি চালের পাইকারি মোকাম। বর্তমানে এই বাজারে ৫০ থেকে ৬০টি চালের পাইকারি দোকান আছে। এখান থেকেই পুরো দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পাইকারি বাজারগুলোতে চাল সরবরাহ হয়। দিনাজপুর চাল ভান্ডারের স্বত্বাধিকারী মো. ফারুক শেখ জানান, এখন চিকন চাল ও আটাশ (২৮) চালের বিক্রি সবচেয়ে বেশি। পাশাপাশি অন্য জাতের চালও প্রচুর বিক্রি হয়। এ অঞ্চলের বিভিন্ন বাজারের পাইকারি ব্যবসায়ীরা এখান থেকে চাল কিনে নেন।

মসলাপট্টি বেশ জমজমাট

ওয়েস্ট মেকট রোড পার হয়ে ভৈরব স্ট্র্যান্ড রোডের দিকে এগোলেই চোখে পড়ে কাঁচা মসলার পাইকারি আড়তগুলো। স্থানীয়ভাবে পরিচিত ‘কাঁচাপট্টি’র পাইকারি দোকানগুলোর প্রধান পণ্য হলো হলুদ, মরিচ, পেঁয়াজ, রসুন, আদাসহ অন্যান্য মসলা। পাশেই মসলাপট্টির খুচরা দোকানগুলোতে গুঁড়া বা প্রক্রিয়াজাত মসলা বিক্রি হয়। তিন দশকের বেশি সময় ধরে কাঁচাপট্টিতে ব্যবসা করছেন মেসার্স নিউ মেহেদী বাণিজ্য ভান্ডারের স্বত্বাধিকারী শেখ মো. আবুল হাসান। তিনি বলেন, ‘এখানে পাইকারি কাঁচা মসলার শতাধিক দোকান রয়েছে। আমরা কাঁচা মসলার পাশাপাশি মৌসুমে পাইকারি ফলের ব্যবসা করি। বিভিন্ন জায়গা থেকে এখানে পণ্য আসে। এরপর এখান থেকেই খুলনাসহ আশপাশের জেলাগুলোতে সরবরাহ হয়।’

চাল ও মসলার পাশাপাশি ফলমূল, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, প্লাস্টিক সামগ্রী, কাপড়, প্রসাধনী, সবজি ও অলংকারের বহু প্রতিষ্ঠান রয়েছে। কেসিসির ট্রেড লাইসেন্স শাখার সহকারী সুপারিনটেনডেন্ট শেখ হুমায়ুন কবীর জানান, বাজারে ট্রেড লাইসেন্স নেওয়া ছোট-বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান আছে ৩ হাজার ৬৫০টি। এর বাইরে দৈনিক টোলের ভিত্তিতে অনুমোদিত দোকান আছে আরও ৪৬০ থেকে ৪৭০টি। এ ছাড়া বাজারে এক হাজারের কাছাকাছি ভাসমান দোকান ও হকার রয়েছে। সব মিলে পাঁচ হাজারের বেশি ব্যবসায়ী আছেন। নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান থেকে সরকারের বার্ষিক রাজস্ব আয় হয় ছয় কোটি টাকার বেশি। কেসিসির বাজার সুপারিনটেনডেন্ট শেখ শফিকুল হাসান দিদার বলেন, দৈনিক টোলের ভিত্তিতে অস্থায়ী দোকানগুলো থেকে বছরে গড়ে ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকার রাজস্ব আদায় হয়।

অর্থনীতিকে সচল রাখছে ব্যাংকিং সেবা

এখানকার অর্থনৈতিক কর্মযজ্ঞকে কেন্দ্র করে স্থাপিত হয়েছে বহু ব্যাংকের শাখা। ব্র্যাক ব্যাংকের বড় বাজার শাখার ব্যবস্থাপক এস এম আশরাফুল ইসলাম জানান, বাজার ঘিরে সরকারি-বেসরকারি ব্যাংকের ৩৩টি শাখা আছে। শুধু ব্র্যাক ব্যাংকই বাজারের ৭৭৪টি প্রতিষ্ঠানকে বছরে গড়ে ৩০০ কোটি টাকার মতো ঋণ দিচ্ছে।

বাজারের পরিবর্তন

ভৈরব নদের গ্রাস এবং উন্নয়নের চাহিদায় জমি অধিগ্রহণের কারণে বাজারের আয়তন ও প্রসার খানিকটা কমেছে। তবে পণ্যে এসেছে নতুন বৈচিত্র্য। একসময় শুধু পাইকারি বাজারের ঐতিহ্য থাকলেও এখন খুচরা দোকানের সংখ্যাও বাড়ছে।

ব্যবসায়ীরা বলেন, ২০ বছর আগেও এ অঞ্চলের নিত্যপ্রয়োজনীয় ও ভোগ্যপণ্যের ৭৫ থেকে ৮০ শতাংশই সরবরাহ হতো এই বাজার থেকে। এখন ব্যবসার বিকেন্দ্রীকরণ হয়েছে। মেসার্স মুনীর আহমেদ অ্যান্ড ব্রাদার্সের স্বত্বাধিকারী ও ব্যবসায়ী নেতা মুনীর আহমেদ বলেন, বড় বাজারের দোকানপাট বাড়লেও বাজারের অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধা বাড়েনি। রাস্তাগুলো এতই সরু যে কোনো মালবাহী ভারী যানবাহন সহজে ঢুকতে পারে না। চালের বস্তার মতো ভারী পণ্য বাজারের বাইরে থেকে কুলির মাধ্যমে দোকানে আনতে হয়। এমন নানা সমস্যায় বাড়তি ব্যয়ের কারণে অনেক ব্যবসায়ী অন্যত্র চলে যাচ্ছেন।

পুরো দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ভোগ্যপণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণ করা ঐতিহ্যবাহী বড় বাজার এখনো বৃহৎ বাণিজ্যকেন্দ্র। সময়ের সঙ্গে বদলে যাওয়া ব্যবসার আধুনিক ধরন, পরিবহনব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা ও অবকাঠামোগত সমস্যায় বাজারটির পুরোনো প্রভাব ও প্রতাপকে অনেকটাই ম্লান করে দিয়েছে। তবু হাজারো ব্যবসায়ী, শ্রমিক, কুলি ও আড়তদারের দৈনন্দিন জীবিকা এই বাজারকে ঘিরেই হচ্ছে।

সূত্র: প্রথম আলো