মাদাগাস্কারের ট্রাভেলস্কেপ: সাহামবানু গ্রামের চা–খানা ও ‘নাদুদানা’
গণমাধ্যম ডেক্স
ভোর থেকে আমরা ভাসছি মাদাগাস্কারের তিরিসিবিহিনা নদীর স্রোতজলে। আমাদের বাহন—স্থানীয়ভাবে পিরাগ বোট নামে পরিচিত, ইঞ্জিনবিহীন লগি ও বইঠাযুক্ত একাধিক নৌকা। সেলফোনের নেটওয়ার্ক কিংবা ইন্টারনেটের বাইরে আজ আমাদের দ্বিতীয় দিন। তাই সোশ্যাল মিডিয়ার অনটনে আমার সহযাত্রীদের দুজন কিঞ্চিৎ উসখুস করছেন,বাদবাকি তিনজন এ নিয়ে উচ্চবাচ্য কিছু করেননি। এ রকম ভেসে ভেসে, পথিমধ্যে তাঁবু খাটিয়ে ক্যাম্পিং করে দিন পাঁচেক পর আমরা ‘সিঙ্গি-দে-বেমারাহা’ নামে অত্যন্ত ইউনিক এক শিলাপাহাড়ে পৌঁছার আশা রাখি।
ঘণ্টা খানেক ধরে আমাদের পিরাগ বোটগুলো দহের মতো সম্প্রসারিত হওয়া জলীয় পরিসরে, কচুরিপানা ও বাঁশের চালি থেকে ছিটকে পড়া ভাঙাচোরা টুকরা-টাকরা সামলে কায়ক্লেশে আগ বাড়ছিল। হঠাৎ নদীটি সংকীর্ণ হয়ে ভাটিয়ালি গানের প্রলম্বিত সুরের মতো চোরাস্রোতের টানে ছুটতে শুরু করে মসৃণ গতিতে। এখানে নদীপাড়ের একদিকে নিবিড় অরণ্য, অন্যদিকে আদিগন্ত প্রসারিত বালুচর। একঘেয়ে ভাব কাটানোর প্রয়োজনে আমি বাইনোকুলারে চোখ রাখি। বালিয়াড়িতে আধার খোঁটা পাখপাখালি প্রচুর, কিন্তু ব্যাকপ্যাক খুলে খুঁজে পাই না—বার্ড আইডেনন্টিফিকেশন জাতীয় সচিত্র পুস্তকাদি; উল্টো হাতে উঠে আসে দিনওয়ারি জার্নাল লেখার নোটবুক। পৃষ্ঠা ওলটাতে চোখে পড়ে যাত্রাসঙ্গীদের প্রোফাইল-বিষয়ক আমার নোটস।
এ বোটট্রিপে আমার সহযাত্রী হচ্ছেন ফরাসি দেশের নেভি থেকে অবসরপ্রাপ্ত বান্দা মসিয়েঁ আরিস্তিদ ও তাঁর মরোক্কান বান্ধবী, বেলিড্যান্সে বেজায় পারঙ্গম নারী কাহিনা। মসিয়েঁ শখের নৃতাত্ত্বিক, ভিন দেশের ভাষা শেখাতেও তাঁর আগ্রহ অশেষ। পাখি দেখতে আটঘাট বেঁধে কাহিনা মাদাগাস্কারে এসেছে। গাছপালা শনাক্তকরণেও তাঁর দক্ষতা উল্লেখযোগ্য।

আমার অন্য সহযাত্রীদের মধ্যে ইসপানিয়ার সিনিয়র থিয়াগো হচ্ছেন প্রৌঢ় এক প্রকৌশলী। হরেক রকমের বয়সজনিত অসুখ-বিসুখে ভুগছেন তিনি। তাঁর ধারণা—নদীপাড়ের আলাভোলা বাতাসে হাঁটাহাঁটি করলে নোয়াপাতি ভুঁড়িটি যেমন নিয়ন্ত্রিত হবে, তেমনি দেহমনেও মশাই পাবেন প্রাকৃতিক তাগদ। সিনিয়র থিয়াগোর অল্পবয়সী সুইটহার্ট হচ্ছে লারেনা, প্রবলভাবে মাদকাসক্ত এ মেয়ে কারামুক্ত হয়েছে বছরখানেক আগে। অজ্ঞাত কোনো কারণে সে সিনিয়রের সঙ্গে আপাতত লিভ টুগেদার করছে।
আমার পথসাথি অন্য পর্যটক হচ্ছেন আলবেনিয়া থেকে যুক্তরাষ্ট্রে আগত অভিবাসী আগনেসা আমেতাজ। মহিলা কিছুদিন আগে হারিয়েছেন তাঁর স্বামীকে। নিরিবিলি প্রকৃতির আগনেসা ভালোবাসেন ক্রসওয়ার্ড পাজল প্রভৃতি। কথাবার্তা বলতে এ মহিলা তেমন পছন্দ করেন না, তবে সাজগোজ করতে প্রচুর মনোযোগ দেন।
প্রচলিত কোনো ট্যুর কোম্পানির হিল্লা না ধরে এ যাত্রায় আমরা নিজেরা নৌকা ভাড়া করে, স্থানীয় বাজার থেকে রসদাদি খরিদ করে নৌযাত্রার বিষয়-আশয়ের ব্যবস্থাপনা করছি। মাদাগাস্কারের নদীপথের মানচিত্র সম্পর্কে মসিয়েঁ আরিস্তিদ তাত্ত্বিকভাবে ওয়াকিবহাল হলেও আমরা তাঁর ওপর পুরোপুরি ভরসা না করে সহায়তা নিচ্ছি, ডাডাডি-তাসা নামের এক পিটারি-ডালানা বা রিভার গাইডের। এক আমলের ঝাঁনু মাঝি ডাডাডি-তাসা, হালফিল বাণিজ্যিকভাবে চালু ছোটোখাটো পিরাগ বোট বহরের রিভার গাইড হিসেবে কাজ করে থাকেন। যেহেতু তিরিসিবিহিনার নদীপথে চলাচল করা পর্যটকদের নৌকায় সম্প্রতি ঘটেছে ছিনতাই, রাহাজানি ও ধর্ষণের মতো একাধিক ঘটনা, আমরা ডাডাডি-তাসার পরামর্শে সহযাত্রী করে নিয়েছি, ফেতরেসেনা নামের নৌকার নিরাপত্তায় অভিজ্ঞ এক লেঠেলকে।
সহযাত্রীদের প্রোফাইল-বিষয়ক নোটস খুঁটিয়ে দেখে নিয়ে এ যাত্রায় তাঁদের দিনযাপন সম্পর্কে আরও যেসব তথ্য আমাকে জোগাড় করতে হবে, বুলেট পয়েন্টে তার একটি তালিকা করতে শুরু করি। হঠাৎ দমকা হাওয়ায় আমাদের পিরাগ বোটগুলো ব্যাপকভাবে দোদুল্যমান হয়ে ওঠে, টারবুলেন্ট হয়ে ওঠা স্রোতজলে খাবি খেতে খেতে, চেষ্টা করে নদীপাড়ের কিনার ধরে আগ বাড়তে।
দেখতে দেখতে তিরিসিবিহিনার নদীর মূল খাত থেকে সরে এসে পাহাড়ঘেঁষা লেগুনের অগভীর জলে আমাদের নাওগুলো নোঙর ফেলে। দুপুর গড়িয়ে বিকেল হতে চলল, কিন্তু লাগোয়া স্যান্ডবারের কোথাও সূর্যালোকের কমতি নেই। ভেজা পায়ে আমরা উঠে আসি রোদঝলসানো চরে। এদিকে জনমানুষ বলতেও কেউ নেই, শুধু নাড়া দিয়ে তৈরি একটি ‘উরা’ দাঁড়িয়ে আছে ছায়াময় বিশ্রামের সম্ভাবনা নিয়ে। সাহামবানু নামের গ্রামটি সামান্য দূরে। মাঝিরা ক্লান্ত, তাই আমাদের রিভার গাইড ডাডাডি-তাসা এখানে ডেরা খাঁটিয়ে রাত গুজরানোর সিদ্ধান্ত নেন। আমার সহযাত্রীরা চরে পা দেওয়ামাত্র ছড়িয়ে পড়ে নানা দিকে।
প্রচলিত কোনো ট্যুর কোম্পানির হিল্লা না ধরে এ যাত্রায় আমরা নিজেরা নৌকা ভাড়া করে, স্থানীয় বাজার থেকে রসদাদি খরিদ করে নৌযাত্রার বিষয়-আশয়ের ব্যবস্থাপনা করছি। মাদাগাস্কারের নদীপথের মানচিত্র সম্পর্কে মসিয়েঁ আরিস্তিদ তাত্ত্বিকভাবে ওয়াকিবহাল হলেও আমরা তাঁর ওপর পুরোপুরি ভরসা না করে সহায়তা নিচ্ছি, ডাডাডি-তাসা নামের এক পিটারি-ডালানা বা রিভার গাইডের। এক আমলের ঝাঁনু মাঝি ডাডাডি-তাসা, হালফিল বাণিজ্যিকভাবে চালু ছোটোখাটো পিরাগ বোট বহরের রিভার গাইড হিসেবে কাজ করে থাকেন।
আরিস্তিদ খুঁজে পান বিরাট একটি পাথর, তাতে বসে পড়ে মসিয়েঁ ওয়ার্ডবুক খুলে জপতে শুরু করেন ‘মালাগাছি’ ভাষার শব্দাদি। তাঁর নারীসঙ্গী কাহিনা বালুকায় ইয়োগা ম্যাট পেতে প্রস্তুতি নিচ্ছে যোগব্যায়ামের। খানিক দূরে ফোমের পিলোতে বসে আগনেসা, তাঁর হাতে ধাতব একটি পাজল, বস্তুটি ইন্টারলিংক কাস্ট পাজল নামে পরিচিত, মহিলা জড়িয়ে-মড়িয়ে জবরদস্ত রকমের জটিল হয়ে ওঠা ধাতব খণ্ডগুলোর জট ছুটানোর চেষ্টা করছেন। সিনিয়র থিয়াগো বোধ করি গরমে রীতিমতো ঘা খেয়ে গেছেন, তিনি টি–শার্টটি খুলে রেখে আদুল গায়ে ছিটাচ্ছেন নদীজল। তাঁর সদ্য যুবতী হয়ে ওঠা নারীসঙ্গী লারেনা প্রকাণ্ড একটি পাথরের গামলার মতো গর্তের পানিতে বিকিনি-বটম চুবিয়ে বসেছে সূর্যস্নানে, মেয়েটির ঊর্ধ্বাঙ্গে জলের ছিটাগুলো কিরণে মুক্তার মতো দীপ্যমান হয়ে উঠেছে।
সহযাত্রীদের হরেক রকমের কর্মকাণ্ডে আমি আমোদ পাই, সাথে সাথে নদীজলে হাঁটু অব্দি চোবানো সিনিয়র থিয়াগোর আচরণে শঙ্কিতও বোধ করি। এ বোটট্রিপে আমি এক অর্থে ব্যবস্থাপকের দায়িত্ব পালন করছি। তো এ মুহূর্তে কুলাঙ্গার গোছের কোনো কুম্ভীর যদি সিনিয়রকে খামচে ধরে, টেনেহেঁচড়ে জলতলে খাদ্যবস্তু হিসেবে মজুত করে, তাহলে লরেনাকে সান্ত্বনা দেওয়া আমার জন্য হয়ে উঠবে চ্যালেঞ্জিং। এ ধরনের কোনো ট্র্যাজেডি চাক্ষুষ করতে চাই না, তাই অ্যাভয়ডেন্স হিসেবে আমি নির্জন উরায় ঢুকে শেল্টার নিই।
উরাটিতে পাওয়া যায় বাঁশবেতে তৈরি একটি মাচা। পা থেকে ব্রেইস খুলে নিয়ে তাতে বসি। দূর—অনেক দূর থেকে ভেসে আসে কোকিলের কুহুধ্বনি। চরে ডাডাডি-তাসার ছায়া পড়ে। বালুকায় রাবার বুটের ছাপচিত্র এঁকে কাঁচুমাচু মুখে তিনি এসে আমার সামনে দাঁড়ান। যেন কোনো অপরাধ করেছেন এমন ভঙ্গিতে জানান, রূপসী কোনো নারীর সান্নিধ্যে এলে গাছ থেকে ফুল, হতে পারে বুনো অর্কিড, পেড়ে তাঁকে উপহার দেওয়া হচ্ছে তাদের ‘ফম্বা’ বা ঐতিহ্য। তো ওই ধারণার বশবর্তী হয়ে তিনি আগনেসার হাতে তুলে দিতে চেয়েছিলেন একগুচ্ছ তাজা কমেট-অর্কিড। হিতে বিপরীত হয়েছে, মহিলা স্পষ্টত রুষ্ট হয়েছেন। তো বুঝতে পারছেন না এর প্রতিকার করবেন কীভাবে?
নারীরা নানা কারণে হরহামেশা আমার ওপরও রুষ্ট হন। তাঁদের তুষ্ট করার প্রক্রিয়া সম্পর্কে আমি ঠিক ওয়াকিবহাল নই। ডাডাডি-তাসাকে এ বিষয়ে উপদেশ দেওয়ার অধিকারও রাখি না। কিন্তু প্রতিক্রিয়ায় কিছু একটা বলতে তো হয়, তাই বলি, ‘লেট ইট গো ডাডাডি, জাস্ট ইগনোর ইট।’ আমার ইংরেজি বুলির মর্মার্থ তিনি বুঝতে না পেরে নীরবে বোলতার মতো চঞ্চল দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন। আমি মালাগাছি ওয়ার্ডবুক খুলে পৃষ্ঠা উল্টিয়ে খুঁজে পাই যথাযথ রেসপন্স, কনফিডেন্স নিয়ে বলি, ‘আঝা মানাহি,’ বা ‘নেভার মাইন্ড, ডোন্ট ওরি।’ তাঁর মাতৃভাষার অপপ্রয়োগ কিংবা অপ–উচ্চারণে তিনি ফিকফিকিয়ে হাসেন।
জানাতে চাই, ‘ডাডাডি, এ গ্রামে কোনো ওমবিয়াসা বা শ্যামান আছেন কি?’ সাহামবানু গ্রামটি তাঁর চেনা। এখানে কোনো শ্যামান না থাকলেও অত্যন্ত জ্ঞানী বয়োবৃদ্ধ একজন ভিলেজ এলডার আছেন। আমার আগ্রহ দেখে তিনি গ্রামবুড়ো মুরব্বির সঙ্গে সাক্ষাৎ করিয়ে দিতে রাজি হন।
একটু গরজ করে তৎক্ষণাৎ চলে আসি সাহামবানু গ্রামে। তেমন উঁচু নয়—এ রকম একটি টিলার ঢালে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে গড়ে উঠেছে পল্লিটি। প্রবেশপথে দাঁড়িয়ে কয়েকটি ন্যাংটাপুটো শিশু অবাক হয়ে আমাদের দেখে, পরস্পরের গায়ে ঢলে পড়ে কিছু বলেও, তারপর হেসে হইহই করে ওঠে। আমি তাদের ‘সালামা’ বলে সম্বোধন করি। হাসির হররায় উদ্বেলিত হয়ে তারা একসঙ্গে আওয়াজ দেয়—‘ভাহিনি ভাহিনি,’ বা ‘স্ট্রেনজার স্ট্রেনজার’। এগিয়ে গিয়ে আমি বিতরণ করতে চাই কিছু ক্যান্ডি, কিন্তু সুযোগ পাই না। খিলখিলিয়ে চতুর্দিকে ছুটে গিয়ে ছত্রখান হয় এরা।
সামনে বাড়ি, গ্রামের এদিকটা জংলামতো, পরস্পরের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা বিচিত্র দুটি বৃক্ষ আমার মনোযোগ আকর্ষণ করে। ভাস্কর্যের মতো সুদর্শন জোড়া উদ্ভিদটি মনে হয় প্রজাতিতে ফিকাস। একটু নজর করতেই আবিষ্কার করি, এদের শরীর থেকে যেন বেরিয়েছে নানা বয়সের আরও তিনটি তরুণ তরুবর, একটি বয়সে নিতান্ত শিশু, তার দেহটি ঘিরে জড়িয়ে আছে ছোট্ট ছোট্ট লোহিত ফুলে ভরা লতা। উড়ে আসে দুটি বেজায় ক্ষুদ্র তীব্র সবুজ সানবার্ড, ঢুকে পড়ে তারা লতানো পত্রালির ঈষৎ আবডালে ঝুলন্ত মিনিয়েচার এক নীড়ে।
কে যেন আমার কাঁধে নীরবে হাত রাখে, ঘুরে তাকাই, দেখি—কাহিনা, গোলাকার মুখমণ্ডলে খুশির পূর্ণিমা ফুটিয়ে নারীটি বলে ওঠে, ‘লেটস সেলিব্রেট ইয়োর ফার্স্ট সাইটিং অব সুইমাঙ্গা সানবার্ড।’ ভাবি, রমণীটির গতরের কোথাও চুম্বন করে বিষয়টি উদ্যাপন করব, কিন্তু মুখটি ফেরানোর সাথে সাথে ঝোপঝাড় ভেঙে কুঠার হাঁকড়িয়ে এসে দাঁড়ান কাহিনার যাত্রাসঙ্গী আরিস্তিদ! কুঠারাঘাতে বেঘোরে বিদেশবিভুঁইয়ে অক্কা পাওয়ার কোনো বাসনা আমার নেই। তাই চটজলদি রিট্রিট করি। আমাকে হুঁশিয়ার করে দিয়ে তিনি আওয়াজ দেন, ‘বি কেয়ারফুল সুলতান, দিস ইজ দ্য ট্যাবু ট্রি অব দিস ভিলেজ, ইউ মাস্ট নট টেইক ইটস পিকচার।’
একটু গরজ করে তৎক্ষণাৎ চলে আসি সাহামবানু গ্রামে। তেমন উঁচু নয়—এ রকম একটি টিলার ঢালে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে গড়ে উঠেছে পল্লিটি। প্রবেশপথে দাঁড়িয়ে কয়েকটি ন্যাংটাপুটো শিশু অবাক হয়ে আমাদের দেখে, পরস্পরের গায়ে ঢলে পড়ে কিছু বলেও, তারপর হেসে হইহই করে ওঠে। আমি তাদের ‘সালামা’ বলে সম্বোধন করি। হাসির হররায় উদ্বেলিত হয়ে তারা একসঙ্গে আওয়াজ দেয়—‘ভাহিনি ভাহিনি,’ বা ‘স্ট্রেনজার স্ট্রেনজার’। এগিয়ে গিয়ে আমি বিতরণ করতে চাই কিছু ক্যান্ডি, কিন্তু সুযোগ পাই না। খিলখিলিয়ে চতুর্দিকে ছুটে গিয়ে ছত্রখান হয় এরা।
ছবি নাহয় না-ই তুললাম, কিন্তু মসিয়েঁ কুঠারটি পেলেন কোথায়, জানতে চাই—তার মতলব কী? পারফেক্ট ফরাসি কায়দায় ঝুঁকে বাও করে জানান, সন্ধ্যার পর বালুচরে ক্যাম্পফায়ারের আয়োজন করতে চান। জঙ্গল থেকে ইতিমধ্যে জোগাড় করেছেন গাব্দাগোব্দা একটি গাছ। গ্রামের এক লোকের কাছ থেকে ধার নিয়েছেন কুড়ালটি, এখনই কেটেছেঁটে লাকড়ি করে না রাখলে ক্যাম্পফায়ারের আগুন ভালোভাবে জ্বালানো যাবে না।
ততক্ষণে গুপ্তিগোছের লাঠি হাতে পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন এই ট্রিপে আমাদের নিরাপত্তারক্ষী ফেতরাসেনা। তাঁর শিবঠাকুরী কায়দার জটাজুট থেকে ডেকোরেশন হিসেবে ঝুলছে ছোটখাটো বাদুরের দুটি কঙ্কাল, চোখ দুটি প্রচুর উইড সেবনে ধারণ করেছে খুনখারাবির বর্ণ। কুড়াল হাতে আরিস্তিদকে দেখতে পেয়ে তিনি খামোখা হাসেন, মারণাস্ত্রটি তাঁর হাত থেকে তুলে নিয়ে ধারালো ইস্পাতে চুকুস করে চুমো খেয়ে প্রস্তাব করেন লাকড়ি করার দায়দায়িত্ব তাঁর হাতে তুলে দিতে। গ্রাম থেকে মেহনতি কোনো পুরুষ খুঁজে পেতে বের করে তাঁকে দিয়ে কাঠ কেটে ক্যাম্পফায়ারের বন্দোবস্ত করে রাখবেন। এ প্রস্তাবকে কারামুক্তির আদেশের মতো শোনায়। আমি আলগোছে তাঁর হাতে টিপসের কড়ি ধরিয়ে দিয়ে আগ বাড়ি।
কয়েক পা সামনে যেতেই এসে পড়ি, শণে ছাওয়া একটি কুঁড়েঘরের কাছে। দিনের কাজবাজ শেষে, পাটি বিছিয়ে দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে বসেছেন গৃহিণী, শিশুকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সম্ভবত তাঁর পুত্রবধূ, আরেকটি বাচ্চাকে দেখভাল করছে ছোট্ট একটি মেয়ে। আমাদের পদ–শব্দে ছয়টি ছানাসমেত মা মুরগিটি কক কক করে ওঠে। জবানে-ইশারায় আমি ছবি তোলার অনুমতি চাই, মাথা হেলিয়ে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে সম্মতি জানান মহিলা। চোখ রাখি ভিউ ফাইন্ডারে, দেখি—রীতিমতো দুধদাঁত দেখিয়ে পোজ দিচ্ছে একটি শিশু।
কুঁড়েঘরটির আঙিনা ছাড়িয়ে সামনে যেতে গিয়ে অনুভব করি, গ্রামীণ পরিবারটির অবসর দিনযাপন আমার মনে তৈরি করছে কিছু একটা না পাওয়ার প্রচ্ছন্ন হাহাকার। মনে হয়, জিন্দেগিভর হিল্লিদিল্লি না করে কোথাও নিরিবিলি বসে যদি পান করা যেত এক পেয়ালা চা! চাকতি চাকতি করে কাটা জেবু বা গরুর শিঙে তৈরি মালা গলায় এক প্রৌঢ় আমাদের সালামা বলে সম্ভাষণ করেন। সাহামবানু গ্রামের বয়োবৃদ্ধ মুরব্বির সম্পর্কে ইনি ভ্রাতুষ্পুত্র। বৃদ্ধ একটু জিরিয়ে নিচ্ছেন, চাইলে কিছুক্ষণ পর তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করা যাবে। ডাডাডি-তাসা সংকোচভরে জানান, গ্রামের রেওয়াজ হচ্ছে, বয়োবৃদ্ধদের সঙ্গে দেখাসাক্ষাতে সামান্য কিছু উপহার নিয়ে যাওয়া। তিনি আমাদের কাছাকাছি হাট থেকে নজরানার দ্রব্যগুলো কিনে নিতে উপদেশ দেন।
হাটপানে রওনা দিতে ইতস্তত করতে দেখে ডাডাডি আমাদের উৎসাহ দিয়ে বলেন, ‘ওখানে একটি টি–স্টল আছে। চাইলে আমরা মাদাগাস্কারের এক পেয়ালা গরম চা-ও চাখতে পারি।’ পর্যটনপুঁথি ঘেঁটে জেনেছি, মাদাগাস্কারে চা-বাগানের সংখ্যা মাত্র একটি, বাগিচাটির নাম ‘শাহামবাভি’। ভাবি—স্থানীয়ভাবে উৎপন্ন একটি পাতা ও দুটি কুঁড়ির জারিত স্বাদ উপভোগ করা যাক।
হাটপানে রওনা দিতে ইতস্তত করতে দেখে ডাডাডি আমাদের উৎসাহ দিয়ে বলেন, ‘ওখানে একটি টি–স্টল আছে। চাইলে আমরা মাদাগাস্কারের এক পেয়ালা গরম চা-ও চাখতে পারি।’ পর্যটনপুঁথি ঘেঁটে জেনেছি, মাদাগাস্কারে চা-বাগানের সংখ্যা মাত্র একটি, বাগিচাটির নাম ‘শাহামবাভি’। ভাবি—স্থানীয়ভাবে উৎপন্ন একটি পাতা ও দুটি কুঁড়ির জারিত স্বাদ উপভোগ করা যাক।
রীতিমতো নুড়িপাথর ছিটকিয়ে ছুটে এসে আমাদের দেখতে পেয়ে হাঁপাতে শুরু করেন আগনেসা। তাঁর পেছন পেছন ভুকভুকিয়ে এসে ব্রেক কষে দুটি নেড়িকুত্তা। রিল্যাক্স ভঙ্গিতে টাইটস ও স্লিভলেস টপ পরা মহিলার চোখমুখে যুগপৎ খেলছে অভিমান ও অসন্তোষের ছাপ। ডাডাডি কুকুরগুলোকে সামাল দেন। দম ফিরে পেয়ে তাঁকে একা ঘাটে ফেলে আসার জন্য মহিলা আমার ওপর উষ্মা ঝাড়েন। ঠিক বুঝতে পারি না, বোটট্রিপের ব্যবস্থাপক হিসেবে সহযাত্রীদের বেবিসিটিংয়ের দায়িত্বও কী আমার জব ডেস্ক্রিপশনের অন্তর্ভুক্ত?
প্রত্যুত্তরে বলি, ‘ঘাটে আপনি একা হলেন কীভাবে, লরেনা ও সিনিয়র থিয়াগো আপনার কাছাকাছি ছিল না?’ আগনেসা জানান, ‘ওরা মাঝিদের সহায়তায় তাঁবু খাটিয়ে তাতে ঢুকে অলরেডি শুয়ে পড়েছে।’ আরিস্তিদ জানতে চান, ‘আর দে স্ক্রুয়িং ইন ব্রড ডেলাইট?’ উত্তর দিতে গিয়ে আগনেসার চোখমুখে ছড়িয়ে পড়ে ব্লাশের লালিমাভা। বুঝতে পারি, বালুচরের মিঠে হাওয়ায় তাঁদের মধ্যে জাগ্রত হয়েছে প্রণয়প্রবণ রিপু, এটাকে অবদমন না করতে যে এ দম্পতি বদ্ধপরিকর, এ নিয়ে আমার কোনো সন্দেহ থাকে না।
বেলা ফুরিয়ে আসছে, তাই হাটে যাওয়ার প্রস্তাব করি, ‘কামঅন গাইজ, লেটস গো টু দ্য লকেল বাজার অ্যান্ড হ্যাভ আ কাপ অব টি?’ আমার কথায় কাহিনা ও আগনেসা আগ্রহ দেখায়, কিন্তু আরিস্তিদ মুখখানা ভাঙা শামুকের মতো করে তুলে শোল্ডার শ্রাগ করে অনুনাসিকস্বরে বলেন, ‘আই হেইট টি।’ তপ্ত পানীয়ের প্রতি মসিয়েঁর ঘৃণাকে আমলে না এনে আমরা সামনে বাড়ি। মুখখানা আমশি করে আরিস্তিদও যাত্রাসঙ্গী হন।
দেখতে দেখতে সাহামবানু গ্রামটি ছাড়িয়ে আমরা এসে পড়ি নদীচরের লাগোয়া হাটের একমাত্র টি–স্টলটিতে। চায়ের দোকানে খদ্দের বলে কেউ নেই, তবে কয়েকটি বালিকা পরস্পরের চুলে বিনুনি করতে করতে কাটাচ্ছে অপরাহ্ণ। একটি কিশোরী আমাদের আশ্বাস দিয়ে বলে, অসুবিধা নেই, হাটে ঘোরাঘুরি সেরে ফিরে এসো এখানে খানিক পর, মাকে এখনই খবর দিচ্ছি, সে তৈরি করে দেবে চা।
টি–স্টলটি ছড়িয়ে কদম কয়েক আগ বাড়তেই দেখি, গ্রামের জমজমাট হাট, জড়ো হয়েছে ওখানে বেশ কিছু খদ্দের। একটি চালাঘরের বারান্দায় বিক্রি হচ্ছে চাল, আখ, আলু ও সুগন্ধি লেবু। ওই দোকানে তিতকুটে স্বাদের কফিও পাওয়া যায়। এক মগ কফি কিনে নিয়ে আরিস্তিদ গ্রামের মুরব্বির জন্য নজরানার কেনাকাটায় হাত লাগান, খরিদ করেন তিনি এক আঁটি ইক্ষু। পাশেই ছালার টাটে বেশ কতগুলো কাঁঠাল সাজিয়ে রেখে ট্যারা চোখের এক বান্দা থেকে থেকে আওয়াজ দিচ্ছে—‘আমপালিবে আমপালিবে’, মানে কাঁঠালের মালাগাছির প্রতিশব্দ। প্রকাণ্ড ফলগুলোর দিকে তাকিয়ে আগনেসার চোখ দুটি ছানাবড়া হয়ে ওঠে। তাঁর মুখ থেকে আলটপকা বেরিয়ে যায়, ‘মাই গড, হোয়াট দ্য হেল আর দিজ?’
বুঝতে পারি, আলবেনিয়ায় বেড়ে ওঠা নারীটি কস্মিনকালেও এ ধরনের কোনো ফলপাকুড় চাক্ষুষ করেননি। আহার্যটির মহিমা তাঁকে বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করি। বিক্রেতা ট্যারা চোখে কৌতূহলের ঝিলিক ফুটিয়ে কোমরের পেটি থেকে খুলে নেন ধারালো ছুরিকা, কাঁঠালে পোঁচ দিয়ে দুটি কোয়া বের করে বাড়িয়ে দেন আমাদের দিকে। আমি একটি স্বাদ চেখে নিয়ে আগনেসাকে রীতিমতো অনুনয় করি বস্তুটি ভক্ষণ করার জন্য। কিন্তু আমার কথায় চিড়ে ভেজে না। নিরুৎসাহিত না হয়ে মেহনতি মাঝিদের কথা ভেবে দামদর করে কিনে ফেলি বিরাট একটি কাঁঠাল। সমস্যা দেখা দেয় নৌকা অব্দি এটিকে নিয়ে যাওয়া নিয়ে। বিক্রেতা তালপাখায় ডুমো মাছি তাড়াতে তাড়াতে কিছু বলেন, ততক্ষণে মুশকিল আসান করতে এগিয়ে এসেছেন ডাডাডি, আশ্বস্ত করেন তিনি, ‘বিক্রেতার ভাতিজা এখনই এটি পৌঁছে দেবে আমাদের ঘাটে।’
আগনেসাকে কাঁঠালের একটি কোয়া খাওয়ানোর চেষ্টা করেন বিক্রেতা আবার। চটেমটে মহিলা বিচিত্র ভাষায় মুখ ঝামটা দেন, তারপর ধুলাবালু উড়িয়ে হেঁটে যান অন্যদিকে। আমি পরিস্থিতি সামাল দিতে ছুটে গিয়ে আগনেসাকে মোকাবিলা করি। ট্যারা লোকটি নাকি তাঁর শরীরের দিকে আড়চোখে তাকাচ্ছিল, আচরণটিকে তিনি সেক্সুয়াল হেরাসমেন্টের আলামত হিসেবে ধরে নিয়েছেন। বলি, ‘ফর গড সেইক, প্লিজ কামডাউন, আগনেসা।’ আমার দিকে এমনভাবে তিনি তাকান…ঠিক বুঝতে পারি না মহিলা কি আমাকে শুঁড়ির সাক্ষী মাতাল ঠাউরালেন? হাল ছেড়ে দিয়ে সামনে বাড়ি।
বিক্রেতা ট্যারা চোখে কৌতূহলের ঝিলিক ফুটিয়ে কোমরের পেটি থেকে খুলে নেন ধারালো ছুরিকা, কাঁঠালে পোঁচ দিয়ে দুটি কোয়া বের করে বাড়িয়ে দেন আমাদের দিকে। আমি একটি স্বাদ চেখে নিয়ে আগনেসাকে রীতিমতো অনুনয় করি বস্তুটি ভক্ষণ করার জন্য। কিন্তু আমার কথায় চিড়ে ভেজে না। নিরুৎসাহিত না হয়ে মেহনতি মাঝিদের কথা ভেবে দামদর করে কিনে ফেলি বিরাট একটি কাঁঠাল। সমস্যা দেখা দেয় নৌকা অব্দি এটিকে নিয়ে যাওয়া নিয়ে।
এদিকে গাছতলায় টেবিল পেতে বসে তেলেভাজা বিক্রি করছে চারটি বালিকা। আমি এদের ছবি তুলতে যাই, ছোট্ট একটি মেয়ে মুখ ভেংচিয়ে পোজ দেয়। কাহিনাও এসে জোটে, সে হামলে পড়ে কিনে নেয় শালপাতার ঠোঙাভর্তি তেলতেলে ভাজাভুজা। কাঠবিড়ালির মতো গাল ফুলিয়ে একসঙ্গে দুটি তেলেভাজা খেতে খেতে চোখমুখে প্রচুর স্যাটিশফ্যাকশন নিয়ে সে আমার দিকে তাকায়। জুতসই একটি মন্তব্য করতে আমার মুখ চুলবুল করে ওঠে। সাতপাঁচ ভেবে অতঃপর বলেই ফেলি, ‘পথেঘাটে বাদাছাদা যা পাও তা কিনে খেতে শুরু করলে…।’ আরেকটি তেলেভাজা মুখে দিয়ে কাহিনা জানতে চায়, ‘হোয়াট ইজ ইয়োর পয়েন্ট? স্পেল ইট আউট, কুইক।’
জবাব দিই, ‘এসব খেলে…ইয়োগা এরোবিকস যা–ই করো না কেন, ফায়দা কিছু পাবে না কাহিনা, ভোজন নিয়ন্ত্রণে আনতে না পারলে শুধু ওজন বৃদ্ধিই নয়, কোমরের পরিধিও দিনকে দিন বাড়বে বৈ কমবে না, আন্ডারস্ট্যান্ড?’ রিঅ্যাক্ট করে সে দ্রুত, মুখ ঝামটা দিয়ে বলে, ‘দিস ইজ দ্য পারফেক্ট এগজাম্পল অব মেইল শোভিনিজম…স্ক্রু ইউ সুলতান, আই মিন ইট।’
পরপর দুই নারীর কাছ থেকে গাতরম্বা খেয়ে যারপরনাই হতোদ্যম হই। ভাবি, এবার এক পেয়ালা চা-পান করে মনজ্বালা জুড়ানো যাক। এক ব্যাগ চাল, ছটফটে একটি মুরগি ও ‘লাম্বা’ নামে তাঁতে বোনা একখানা গামছা নিয়ে কাছে এসে দাঁড়ান আরিস্তিদ। বুঝতে পারি, গ্রামবুড়োকে নজরানা দেওয়ার জোগাড়যন্ত্র করে এসেছেন মসিয়েঁ। তাঁকে ধন্যবাদ দিতে যাই, ঠিক তখনই ছুটে এসে আমার ওপর হামলে পড়ে কাহিনা মুখে গুঁজে দিতে চেষ্টা করে একটি তেলেভাজা, আমি খেতে না চাইলে সেল্ফ ডিফেন্সের ক্লাসে শেখা তায়কোয়ান্দোর একটি মোক্ষম প্যাঁচ কষে নারীটি আমাকে বেমক্কা কাবু করে ফেলে। তারপর মুখে ঠেসে ধরে তেলেভাজা। প্রাণরক্ষার্থে আমি চিবোই, চালের গুঁড়ির পিষ্টকটি স্বাদে কিন্তু খারাপ না। আগনেসাও এসে জোটেন। কাহিনা চায়ের পাট চুকিয়ে ফেলার প্রস্তাব করে।
কাহিনার সঙ্গে দৈহিকদ্বন্দ্বে পরাস্ত হয়ে খিন্নমনে নারী দুটির সাথে নিরাপদ দূরত্ব রেখে টি–স্টলের দিকে হাঁটছিলাম। দারুণ সহানুভূতি নিয়ে কথা বলেন আরিস্তিদ, ‘নেভার মাইন্ড সুলতান, কাহিনা ইজ ফিজিক্যালি আ বিট অ্যাগ্রেসিভ…।’ তারপর কণ্ঠস্বর নামিয়ে ফিসফিসিয়ে হুঁশিয়ার করে দেন, ‘তুমি যদি তার সঙ্গে শোবার পরিকল্পনা করে থাকো, প্লিজ বি কেয়ারফুল, শি ইজ ভেরি স্ট্রং অ্যান্ড ডিমান্ডিং।’ বুঝতে পারি, মসিয়েঁ জেনেশুনে নিজের বিদগ্ধ অভিজ্ঞতাটি শেয়ার করছেন। সতর্ক হই, তো পুরুষ হিসেবে আমি বীরেন্দ্র না হলেও আত্মরক্ষায় যে একেবারে অসমর্থ, এটা মনে করার কোনো কারণ নেই। পরবর্তী সময়ে আবার আক্রান্ত হলে কীভাবে প্রতিরোধ করব, তাঁর জুতসই মারপ্যাঁচ ভাবতে ভাবতে এসে ঢুকি টি–স্টলে।
কাহিনা জম্পেশ করে চা খাওয়ার জন্য হাট থেকে কিনে এনেছে, পুদিনাপাতার ছোট্ট একটি আঁটি। সে আগনেসাকে মরক্কোতে মিন্ট-টি খাওয়ার রেওয়াজের কথা বুঝিয়ে বলছে। আগনেসা বেড়ে উঠেছেন আলবেনিয়ার তিরানা শহরে। ওখানে ব্ল্যাক-টির তেমন চল নেই, তবে পাহাড় থেকে সংগ্রহ করা ‘টাজি-মালি’ বা লতাপাতা ও শিকড়ের জারিত নির্যাসে তৈরি শেফার্ড-টি নামে একধরনের উষ্ণ পানীয়ের চল আছে। তিনি ব্ল্যাক-টি চেখে দেখতে আগ্রহী, আমিও মুখিয়ে আছি। তো তপ্ত হাঁড়ি থেকে নারকেলের ঠালিতে যা পরিবেশিত হয়, তা হরেদরে থিকথিকে ধূসর ক্বাথ, তাতে ভাসছে অবিকল পিপীলিকার মতো দেখতে জ্বলাপোড়া ভাতের অনেকগুলো দানা!
জার্নি বাই বোট গ্রুপের ব্যবস্থাপক হিসেবে আমি শাহামবাভি চা-বাগানের পিওর মালাগাছি ব্ল্যাক–টি ডিমান্ড করি। মাথায় আধভাঙা মৌচাকের মতো খোঁপাওয়ালা এক মহিলা, সম্ভবত টি–স্টলের বালিকাগুলোর মা কিংবা খালা, এগিয়ে এসে আমায় মোকাবিলা করেন। তিনি খুন্তি দিয়ে হাঁড়ির উত্তপ্ত ক্বাথ ঘাঁটতে ঘাঁটতে বিরসবদনে উচ্চারণ করেন, ‘রানোভোলা।’ বস্তুটি কী বুঝতে না পেরে ডাডাডি-তাসার দ্বারস্থ হই। তিনি তুমুল উৎসাহ নিয়ে ব্যাখ্যা করেন, মালাগাছি ব্ল্যাক–টি পান করতে হয় সূর্য ওঠার ঠিক পরপর। বিকেলের দিকে চা বলতে মাদাগাস্কারে রানোভোলা নামে যা প্রচলিত, তা হচ্ছে ব্রান্ট রাইস টি; অর্থাৎ ভাতটাত খাওয়ার পর ডেগের তলা চেঁছে পোড়াভাতের সঙ্গে মাড় মিশিয়ে পান করা। ডাডাডি তাঁর জটাজুটের বিনুনি শাহাদাত আঙুলে প্যাঁচাতে প্যাঁচাতে আশ্বস্ত করেন, পানীয়টি স্বাদে শুধু তোফাই না, বেজায় পুষ্টিকরও।
কাহিনা জম্পেশ করে চা খাওয়ার জন্য হাট থেকে কিনে এনেছে, পুদিনাপাতার ছোট্ট একটি আঁটি। সে আগনেসাকে মরক্কোতে মিন্ট-টি খাওয়ার রেওয়াজের কথা বুঝিয়ে বলছে। আগনেসা বেড়ে উঠেছেন আলবেনিয়ার তিরানা শহরে। ওখানে ব্ল্যাক-টির তেমন চল নেই, তবে পাহাড় থেকে সংগ্রহ করা ‘টাজি-মালি’ বা লতাপাতা ও শিকড়ের জারিত নির্যাসে তৈরি শেফার্ড-টি নামে একধরনের উষ্ণ পানীয়ের চল আছে। তিনি ব্ল্যাক-টি চেখে দেখতে আগ্রহী, আমিও মুখিয়ে আছি। তো তপ্ত হাঁড়ি থেকে নারকেলের ঠালিতে যা পরিবেশিত হয়, তা হরেদরে থিকথিকে ধূসর ক্বাথ, তাতে ভাসছে অবিকল পিপীলিকার মতো দেখতে জ্বলাপোড়া ভাতের অনেকগুলো দানা!
আমার পথসঙ্গী নারী দুটি ইতিমধ্যে চামচের বিকল্প ঝিনুকের ভাঙা খোল দিয়ে পান করতে শুরু করেছেন, ভাতের ফেন দিয়ে প্রস্তুত কবোষ্ণ রানোভোলা। টি–স্টলের মহিলা খুন্তিহাতে কড়া নজরে তা তদারকি করছেন। তাঁর চোখমুখে ফুটে উঠছে প্রচুর রেখা, লেখাজোখায় ওনার চরিত্রচিত্রণ হবে দুরূহ, তরমুজের বিচির মতো দাঁত বের করে তিনি হাসেন, আর উপলব্ধি করি—চাইলে ওনাকে মডেল করে অনায়াসে নবাব সিরাজউদ্দৌলার খালা ঘষেটি বেগমের তৈলচিত্র আঁকা যায়।
মসিয়েঁ আরিস্তিদ রানোভোলা পানে ফরাসি ভাষায় তুমুল অনীহা প্রকাশ করেন। বিরক্ত হয়ে কাহিনা তাঁর কলার খামচে ধরে ঝিনুকের খোল দিয়ে মুখে তুলে দেয় পানীয়। আমাকে হেনস্তা করার সময় একটু আগে সে যে দৈহিক দক্ষতার পরিচয় দিয়েছে, বোধ করি তা স্মরণ করে আরিস্তিদ ঝুঁকি নিতে হিম্মত পান না, সুরুৎ করে ফেনে-ভাতে চুমুক দেন। তাঁর মুখমণ্ডলে ফুটে ওঠে হেমলক পানরত সক্রেটিসের প্রতিচ্ছায়া।
উঠে পড়ি আমরা। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসার আগে গ্রামের মুরব্বির সঙ্গে বাতচিতের ব্যাপারটা সেরে নিতে চাই। পল্লিটির মুখপাতে নয়ানজুলির কাছে সুদীর্ঘ একটি পারকিয়া বৃক্ষ, তা থেকে ঝুলছে শুকনো তেঁতুলের মতো ফুটখানেক লম্বা লম্বা ফল। এগুলো কুরে কুরে খাচ্ছে ব্রুচিড নামের একধরনের পতঙ্গ। দাঁড়িয়ে পড়েন ডাডাডি-তাসা, দড়ি বাঁধা একটি জেবু বিরক্ত হয়ে হাম্বা হাম্বা রবে চেঁচায়, অত্যন্ত ছোট দেহের এ গরুর ওলান টসটসে হয়ে আছে, কাছেই বাছুরটি চরছে একাকী।
পাড়ার পয়মন্ত এ মিনিয়েচার জেবু বা গরুটির বিশেষ প্রজাতি ‘নাদুদানা’ নামে পরিচিত। নাদুদানার দুধ শুধু পুষ্টিকরই নয়, ওভারনাইট বাসি ভাতের সঙ্গে মিশিয়ে ফারমেন্ট করলে পরদিন ‘সরোনা’ নামে পানীয়টিতে যুক্ত হয় প্রচুর মাদক গুণ। গ্রামবুড়োর নজরানার কথা ভেবে, হাঁকডাক করে নাদুদানার গৃহস্থের কাছ থেকে আমরা কিনে নিই এক হাঁড়ি সরোনা।
এসে পৌঁছাই আমরা গ্রামবুড়োর বসতবাড়ির আঙিনায়। ঊষর ডাঙার একদিকে বেশ কয়েকটি গাছপালায় তৈরি হয়েছে রীতিমতো এক উপবন। ঝেঁপে ফুটেছে কমেট অর্কিড, কয়েকটি সুইমাঙ্গা সানবার্ড পালকে বেগুনি-সবুজের তীব্র জৌলুশ ছড়িয়ে সুচালো ঠোঁটে পান করছে নেক্টার। আগনেসার সঙ্গে পড়িমরি করে ছুট লাগায় কাহিনা, গোধূলির মায়াবি আলোয় তাদের অর্কিডের মধুপায়ী পাখিদের চাক্ষুষ করা চাই। আমি ও আরিস্তিদ গাঁয়ের বয়োবৃদ্ধ মানুষটির সঙ্গে সহবতের প্রস্তুতি নিই।
নজরানার জিনিসপত্র একটি ঝুড়িতে গুছিয়ে ডাডডি-তাসা আমাদের ছবি তুলতে মানা করেন। তাঁর বক্তব্য হচ্ছে, বছর দশেক আগেও এই গ্রামবৃদ্ধ ছিলেন সাহামবানু পল্লির ভিলেজ হেড। বর্তমানে তাঁর পুত্র পালন করছে সেই দায়িত্ব। গাঁয়ের সাবেক প্রধান হিসেবে তাঁকে মানুষ ‘রে আমান-দ্রোনি’ বা ‘আমাদের মা-বাপ’ সম্বোধন করে থাকে। দূরদূরান্ত থেকে হামেশা লোকজন তাঁর খেদমতে নজরানা নিয়ে এসে হাজির হয় ‘জরো’ বা ‘আশীর্বাদ’ নিতে। আমাদের উচিত গ্রামবুড়োকে ‘তমপকো’ বা ‘রেসেপেক্টেড স্যার’ সম্বোধন করা।
বিসমিল্লাহ বলে ঢুকে পড়ি গ্রামের সাবেক মাতবরের ঘরে। আমার পেছন পেছন মালাগাছি শব্দ ও বাক্যের তালিকাঅলা নোটবুক হাতে আরিস্তিদ। জানালাহীন অন্ধকার কামরায় টিমটিমিয়ে জ্বলছে একটি হারিকেন ও কেরোসিনের দুটি কুপি। তার আলোয় বেতে বোনা হ্যামকে আধশোয়া মুরব্বিগোছের মানুষটি নড়েচড়ে চেষ্টা করেন শিরদাঁড়া সোজা করতে। তালপাখা দিয়ে এক মহিলা বাতাস করছেন। আমাদের তিনি মেঝেতে পেতে রাখা মাদুরে বসে পড়তে ইশারা দেন। ডাডাডি নজরানার জিনিসপত্র গুছিয়ে রাখছে বৃদ্ধের পায়ের কাছে। উপহারের ঝুড়ি থেকে চটপটে মুরগিটি কক কক করে ওঠে; আর আমাকে চমকে দিয়ে আরিস্তিদ বৃদ্ধকে ‘তামপোকো’ বা ‘রেসপেক্টেড স্যার’ সম্বোধন করে পরিষ্কার মালাগাছি ভাষায় সওয়াল করেন, ‘ইমেনো নো ফাডি ইতো?’ বা ‘এ গ্রামের ট্যাবু বা সামাজিকভাবে নিষিদ্ধ কোন জিনিসটি?’
ছানিপড়া চোখ থেকে গড়িয়ে নামা অশ্রু গামছায় মুছে, শ্লেষ্মাজড়ানো কণ্ঠে বৃদ্ধ কিছু বলতে বলতে কাশতে কাশতে রীতিমতো খেই হারান। মহিলা তালপাখাটি রেখে, সরোনার হাঁড়ি খুলে, তা থেকে ঝিনুকে করে বৃদ্ধকে খাওয়ান নাদুদানা গাভির দুগ্ধে প্রস্তুত ফার্মেন্টেড পানীয়। ঠোঁটে লেগে থাকা সরোনা জিবে চেটেপুটে খেয়ে আমেজে তিনি চোখ মোদেন।
তাঁর ধাতস্থ হতে খানিকটা সময় লাগে, ততক্ষণে ডাডাডি-তাসার তরজমায় বুঝতে পেরেছি, সাহামবানু গ্রামের ট্যাবু হচ্ছে, ফিকাস প্রজাতির বৃক্ষটি, গাছ তো ওখানে একটি নয়—একাধিক, রীতিমতো পুত্রকন্যা নিয়ে উদ্ভিদের পুরো এক পরিবার। ওই গাছের ছবি তোলা যেমন নিষিদ্ধ, তেমনি পরদেশ থেকে আগত কারও ওই বৃক্ষের কাছাকাছি হওয়াতেও আছে গাঁওবুড়োর তুমুল আপত্তি। কারণ, গাছটির তলায় সুড়ঙ্গে বসবাস করছে বিরাট একটি সরীসৃপ, সর্পটি প্রেগন্যান্ট, খোকাখুকু হবে, শিকার ধরতে পারছে না, তাই খিদা পেলে ফুসফুসিয়ে প্রকাশ করছে হতাশা। আমরা নজরানা হিসেবে মুরগিটি আনায় বৃদ্ধ খুশি হয়েছেন। গ্রামের হাট থেকে কিছুক্ষণ পর ফিরবে তাঁর ছেলে—এখানকার ভিলেজ চিফ। তিনি ঘরে ফেরার পর মুরগিটি যাবে সর্পরাজের ভোগে।
বৃদ্ধ আবার চোখ মেলে পান করেন আরও খানিকটা সরোনা। ডাডাডি-তাসা আমাদের পরিচয় করিয়ে দেন। কপাল কুঁচকে তিনি আমার দিকে তাকিয়ে থাকেন কিছুক্ষণ, তারপর অনুরোধ করেন স্বদেশ সম্পর্কে কিছু বলতে। আমি নদীমাতৃক বাংলাদেশের বর্ণনা দিয়ে বলি, ‘হুজুর, মাদাগাস্কারের মতো বাংলাদেশেও উৎপন্ন হয় প্রচুর পরিমাণে ধান। আমাদের আমিষের প্রধান উৎস হচ্ছে নদনদী হওর-বিলের মাছ।’
কৌতূহলী হয়ে বৃদ্ধ জানতে চান, ‘চাষাবাদ কি জেবুর ঘাড়ে লাঙল-জোয়াল জুড়ে দিয়ে করা হয়?’ জবাব দিই, ‘বছর বিশেক আগেও জেবু কিংবা গরু দিয়ে হাল চাষ হলেও হালফিল মানুষজন চাষাবাদে ব্যবহার করছে পাওয়ার টিলার।’ আমাকে থামিয়ে দিয়ে আফসোস করে তিনি বলেন, ‘মাদাগাস্কারেও সম্প্রতি প্রচলিত হচ্ছে পাওয়ার টিলার। এ যন্ত্র দিয়ে হাল চাষে সমস্যা অনেক। জেবু তো মাঠে-বাদাড়ে চরে ফিরে নিজে নিজেই খেতে পারে ঘাসপাতা, কিন্তু পাওয়ার টিলারকে খাওয়াতে হয় ডিজেল কিংবা পেট্রল, তা কিনতে খরচ হয় প্রচুর। জেবুর গোবর সার হিসেবে খুবই উৎকৃষ্ট। পাওয়ার টিলার থেকে সারফার তো পাওয়াই যায় না, উপরন্তু ভেঙেটেঙে গেলে তা সারাতেও লাগে টাকাকড়ি।’
কথা বলতে বলতে ফিরে আসে গ্রামবুড়োর প্রবল কাশি। হাঁপানির গমক থিতিয়ে আসতেই তিনি পান করেন পরপর দুই ঝিনুক সরোনা, তারপর চোখ মোদেন। আমরা বিনীতভাবে বিদায় নিই। ঘরের বাইরে দেখা হয় বৃদ্ধের পুত্র ভিলেজ হেডের সঙ্গে। তালপাখায় বাতাস করা মহিলা বেরিয়ে এসে উপহারের মুরগিটি তুলে দেন তাঁর হাতে। বুঝতে পারি, সর্পরাজকে খাওয়ানোর ব্যাপারটা ঘটবে এখনই। মসিয়েঁ আরিস্তিদ তা পর্যবেক্ষণ করতে চান। সাপখোপে আমার তুমুল আতঙ্ক, তাই এদের গুডবাই বলে রওনা হই ঘাটের দিকে।
সূত্র: প্রথম আলো