মায়ের গর্ভে ভ্রূণের বিকাশ: কোরআনের বিস্ময়কর বর্ণনা
গণমাধ্যম ডেক্স
আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান ও ভ্রূণবিদ্যা মাইক্রোস্কোপ ও আলট্রাসাউন্ড প্রযুক্তির সাহায্যে মায়ের গর্ভে মানবভ্রূণের বিকাশের স্তরগুলো আবিষ্কার করেছে খুব বেশি দিন হয়নি।
পবিত্র কোরআনে মাতৃগর্ভে মানবশিশু সৃষ্টির প্রতিটি সূক্ষ্ম ধাপ নিখুঁত বৈজ্ঞানিক পরিভাষায় বর্ণনা করা হয়েছে।
মিশ্রিত বিন্দু
মানব সৃষ্টির প্রথম ধাপ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি মিশ্রিত বীর্য (নুতফাতুন আমশাজ) থেকে...।’ (সুরা দাহর, আয়াত: ২)
আরবি ‘আমশাজ’ শব্দের অর্থ হলো মিশ্রিত। আধুনিক বিজ্ঞান প্রমাণ করেছে, শুধু পুরুষের শুক্রাণু বা শুধু নারীর ডিম্বাণু থেকে মানবভ্রূণ তৈরি হয় না; বরং এই দুইয়ের সংমিশ্রণেই ভ্রূণের প্রথম ধাপ শুরু হয়। কোরআন এই সংমিশ্রণকে চমৎকারভাবে ‘নুতফাতুন আমশাজ’ বলে আখ্যায়িত করেছে।
ঝুলে থাকা রক্তপিণ্ড
গর্ভধারণের কয়েক দিন পর ভ্রূণটি মাতৃগর্ভের (জরায়ুর) ভেতরের দেওয়ালে শক্তভাবে আটকে যায়। কোরআনে এই স্তরকে বলা হয়েছে ‘আলাকাহ’। আল্লাহ বলেন, ‘অতঃপর আমি নুতফাকে আলাকায় পরিণত করেছি...।’ (সুরা মুমিনুন, আয়াত: ১৪)
আরবি ‘আলাকাহ’ শব্দের তিনটি অর্থ রয়েছে: ক. জোঁক, খ. ঝুলে থাকা বস্তু এবং গ. জমাটবদ্ধ রক্ত। অবাক ব্যাপার হলো, গর্ভধারণের ১৫ থেকে ২৪ দিনের মাথায় ভ্রূণটি দেখতে হুবহু একটি জোঁকের মতো হয়।
শুধু আকৃতিতেই নয়, জোঁক যেমন অন্যের শরীর থেকে রক্ত চুষে খায়, ভ্রূণটিও মায়ের জরায়ুর দেওয়ালে ঝুলে থেকে মায়ের রক্ত থেকেই নিজের পুষ্টি গ্রহণ করে।
মাইক্রোস্কোপের নিচে ৪ সপ্তাহের ভ্রূণটি পরীক্ষা করে দেখলে বোঝা যায়, ভ্রূণের পিঠে যে সোমাইট বা হাড়ের প্রাথমিক খাঁজগুলো তৈরি হয়, তা দেখতে হুবহু দাঁতের কামড়ের দাগের মতো মনে হয়। যেন কেউ এক টুকরা চুইংগাম বা গোশত চিবিয়ে রেখে দিয়েছে।
চিবানো গোশতপিণ্ড
আলাকাহ স্তরের পর ভ্রূণটি এমন একটি রূপ ধারণ করে, কোরআনে যাকে ‘মুদগাহ’ বলা হয়েছে। (সুরা মুমিনুন, আয়াত: ১৪)
আরবি ‘মুদগাহ’ শব্দের অর্থ হলো ‘দাঁতে চিবানো এক টুকরা গোশত’।
মাইক্রোস্কোপের নিচে ৪ সপ্তাহের ভ্রূণটি পরীক্ষা করে দেখলে বোঝা যায়, ভ্রূণের পিঠে যে সোমাইট বা হাড়ের প্রাথমিক খাঁজগুলো তৈরি হয়, তা দেখতে হুবহু দাঁতের কামড়ের দাগের মতো মনে হয়। যেন কেউ এক টুকরা চুইংগাম বা গোশত চিবিয়ে রেখে দিয়েছে।
হাড় ও মাংসপেশির আবরণ
চিবানো গোশতপিণ্ডের মতো স্তর পার হওয়ার পর ভ্রূণের ভেতরে হাড় ও মাংসপেশি তৈরি হতে শুরু করে। আল্লাহ বলেন, ‘অতঃপর আমি মুদগাহকে হাড়ে (ইজাম) পরিণত করেছি, এরপর সেই হাড়কে গোশত দ্বারা আবৃত করেছি...।’ (সুরা মুমিনুন, আয়াত: ১৪)
ইবনে কাসির লিখেছেন, এই স্তরে ভ্রূণের ভেতরে কংকাল ও হাড়ের কাঠামো তৈরি হয় এবং এরপর মাংসপেশি ও রগ দ্বারা সেই কাঠামোকে ঢেকে দেওয়া হয়। (ইবনে কাসির, তাফসিরুল কুরআনিল আজিম, ৫/৪৬৪, দারু তাইয়িবাহ, রিয়াদ, ১৯৯৯)
ভ্রূণের বিকাশে প্রথমে কার্টিলেজ বা হাড়ের কাঠামো তৈরি হয় এবং এর পরই পেশিকলা (মাসল টিস্যু) তৈরি হয়ে হাড়গুলো ঢেকে ফেলে।
তিনটি অন্ধকার আবরণ
ভ্রূণটি মায়ের গর্ভে সুরক্ষিত একটি প্রকোষ্ঠে বড় হতে থাকে। আল্লাহ বলেন, ‘তিনি তোমাদের মায়ের গর্ভে পর্যায়ক্রমে সৃষ্টি করেছেন তিনটি অন্ধকারের মধ্যে (জুলুমাতিন সালাস)।’ (সুরা জুমার, আয়াত: ৬)
মাতৃগর্ভের এই তিনটি অন্ধকার পর্দা বা আবরণ হলো—১. মায়ের পেটের বাইরের দেয়াল, ২. জরায়ুর দেয়াল এবং ৩. ভ্রূণের নিজস্ব আবরণ (অ্যামনিওটিক থলি)।
রুহ ফুঁকে দেওয়া
ভ্রূণের শারীরিক কাঠামো তৈরি হওয়ার পর তাতে আত্মা বা রুহ প্রদান করা হয়, যার ফলে ভ্রূণটি একটি পূর্ণাঙ্গ মানবশিশুতে পরিণত হয়। কোরআনে একে ‘এরপর আমি তাকে এক নতুন সৃষ্টিরূপে দাঁড় করিয়েছি’ (সুরা মুমিনুন: ১৪) বলা হয়েছে।
রাসুল (সা.) এই স্তরগুলোর সময়কাল নির্দিষ্ট করে বলেছেন, ‘তোমাদের প্রত্যেকের সৃষ্টির উপাদান মায়ের গর্ভে ৪০ দিন পর্যন্ত বীর্যরূপে (নুতফাহ) জমা থাকে। এরপর পরবর্তী ৪০ দিন তা জমাট রক্তপিণ্ড (আলাকাহ) হিসেবে থাকে। এরপরের ৪০ দিন তা গোশতপিণ্ড (মুদগাহ) হিসেবে থাকে। এরপর আল্লাহর পক্ষ থেকে একজন ফেরেশতা পাঠানো হয়, যিনি ওই ভ্রূণের ভেতর রুহ (আত্মা) ফুঁকে দেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩২০৮)
গর্ভধারণের ১২০ দিন পর ভ্রূণটি আধ্যাত্মিক ও শারীরিকভাবে একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনের মর্যাদা লাভ করে।
সূত্র: প্রথম আলো