|
| |
বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর, ২০২৬, ২০ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

স্বত্ব © ২০২৬ গণমাধ্যম। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।

সর্বশেষঃ

সংস্কৃতি, ইসলাম ও দৈশিকতা

গণমাধ্যম ডেক্স

গণমাধ্যম ডেক্স

প্রকাশ : ০৫ নভেম্বর, ২০২৬, ০৮:০০ এএম
৪১৬ পঠিত
সংস্কৃতি, ইসলাম ও দৈশিকতা
যুক্ত থাকুন
সর্বশেষ খবরের জন্য ফলো করুন:

মোতাহের হোসেন চৌধুরী ‘সংস্কৃতি-কথা’ প্রবন্ধের প্রথম লাইনে লিখেছিলেন, ‘ধর্ম্ম সাধারণ লোকের কালচার, আর কালচার শিক্ষিত, মার্জ্জিত লোকের ধর্ম্ম।’

কালচার এখানে একটা উৎকর্ষ, সর্বসাধারণের ব্যাপার নয়। ইংরেজ নৃতত্ত্ববিদ এডওয়ার্ড বার্নেট টাইলর ১৮৭১ সালে কালচারের যে সংজ্ঞা দিয়েছিলেন (কালচার সর্বজনের, মানবসমাজের কোনো অনুষঙ্গই যার আওতার বাইরে নয়), তা মোতাহের হোসেন চৌধুরীর সংস্কৃতি থেকে যোজন–যোজন দূরে। টেইলরের সংজ্ঞাটাই শুদ্ধ, মোতাহের ভুল—এমন ধরে নিলে উনিশ শতকের চিন্তার ইতিহাসে প্রবেশ আমাদের পক্ষে সহজ হবে না।

কাজী আবদুল ওদুদ খেয়াল করেছেন, উনিশ শতকে ইউরোপে চিন্তার একটা কেন্দ্রীয় ক্যাটাগরি ছিল সংস্কৃতি। এ বিষয়ে চিন্তাচেতনার যে বিবর্তন ঘটছিল, তার একটা ঝটিতি ছবি দিয়েছেন আবুল মনসুর আহমদ, ‘কালচার-চিন্তার প্রথম যুগে ম্যাথু আর্নল্ড বা ওয়াল্ডো এমারসন এর যে সংজ্ঞা দিয়েছিলেন, সেটা ছিল সংকীর্ণ।’ কিন্তু বিশ শতকে এজরা পার্ক ও টেইলর একে খুব ব্যাপ্ত অর্থে এস্তেমাল করেন। আবুল মনসুর আহমদ লিখেছেন, ‘পলিটিক্যাল কালচার’ বা ‘রিলিজিয়াস কালচার’—এ ধরনের কথার মধ্যে এই বিশদ অর্থের প্রয়োগ আছে। এই বিশদ অর্থের পাটাতনেই তিনি নির্মাণ করেন তাঁর নিজের কালচারের ধারণা।

আবুল মনসুর আহমদ আরজ করেন, ‘কোনও সমাজ বা জাতির মনে একটা স্ট্যান্ডার্ড ব্যবহার-বিধি মোটামুটি সার্বজনীন চরিত্র ধারণ করিলেই, সেটাকে ঐ ব্যাপারে ঐ মানব-গোষ্ঠীর কালচার বলা হইয়া থাকে।’ তিনি এর নাম দেবেন ‘সমষ্টির পার্সনালিটি’, তবে সেটার বিস্তার পরে। আপাতত এই আভাস দেওয়া জরুরি যে যদিও আবুল মনসুর আহমদের কালচার কথাটার মূল শাঁস টেইলর-প্রভাবিত, কিন্তু সেটা একই সঙ্গে মোতাহের-কথিত ‘কালটিভেশন’ বা পরিশীলনের অর্থও প্রবলভাবে আমল করে। তাই কালচার একটি করপোরেট পার্সোনালিটি হলেও এর ধনী-গরিব আছে।

কালচার মানে করপোরেট পার্সোনালিটি, তবে সেটা ঋদ্ধ-রিক্ত দুই রকমই হতে পারে—আবুল মনসুর আহমদের এই কালাম সামনে রেখে দুটি প্রস্তাব বিচার করতে চাই। এক. দেশের সীমানা ও জাতীয় সংস্কৃতির সীমানা অভিন্ন হতে হবে। দুই. জাতীয় সংস্কৃতি হবে যারা দেশে সংখ্যাগুরু তাদের জীবনাচারের প্রতিফলন। আবুল মনসুর আহমদ ও আবু মহামেদ হবিবুল্লাহ—এই দুজন বাঙালি মুসলমান চিন্তক হবেন আমাদের আলাপের বনিয়াদ।

২

আবুল মনসুর আহমদ এই দুই প্রস্তাবের পক্ষে সওয়াল করেছেন। অ্যান্ড্রু সার্টোরি তাঁর আবুল মনসুরের সংস্কৃতিবিষয়ক গবেষণায় কৃষ্টি আর ধর্মের পার্থক্যের ওপর ঝোঁক দিয়েছেন। তবে পাক-বাংলার কালচার (১৯৬৬) কেতাবে মনসুর যেভাবে সংস্কৃতি কথাটা বুঝেছেন, সেটা আসলে সভ্যতার বিপরীত। সংস্কৃতি হচ্ছে কোনো সমাজ বা কমিউনিটির ‘এমন কতকগুলি গুণ-সমষ্টি’, যেগুলো একান্তভাবে তাদের নিজস্ব। আমরা যা আছি, তা-ই কালচার; আর আমাদের যা আছে, সেটা সভ্যতা। সংস্কৃতি ও সভ্যতার প্রথম পার্থক্য: ‘বহু জাতির এক সিভিলিয়েশন থাকিতে পারে বটে, কিন্তু এক কালচার থাকিতে পারে না,’ কারণ কালচারের নিজস্ব বা ‘জাতীয় রূপ থাকিতেই হইবে।’

দ্বিতীয় গুরুতর পার্থক্য: ‘সিভিলিয়েশন একটা র্যাশনাল কনস্ট্রাকশন; আর কালচার একটা ইমোশনাল গ্রোথ।’ কালচারের একটা প্রধান মানে ‘কালটিভেশন,’ চাষ অর্থে কর্ষণ। কালচারের প্রতিশব্দ হিসেবে তাই তাঁর পছন্দ ছিল কৃষ্টি, রিফাইনমেন্ট বা তাহ্​যিব—কারণ এসব শব্দের ভেতরের মূল সুর ‘পরিশীলন’। মনসুরের কাছে এটা নিছক কালটিভেশন নয়; এর একটা আবেগের দিক আছে। ফলে সভ্যতা যেমন সব সমাজের সম্পদ হতে পারে; কালচার, মাটিতে প্রথিত গাছের মতোই, ‘মাটি হইতে রস সংগ্রহ’ করে বাঁচে; এখানে মাটি অর্থ একটা সুনির্দিষ্ট সমাজ।

সংস্কৃতি ও সভ্যতার এই বৈপরীত্য সমসাময়িক বাঙালি মুসলমানদের লেখাপত্রে মোটাদাগে অনুপস্থিত। কাজী আবদুল ওদুদ ‘সংস্কৃতির কথা’ প্রবন্ধে (১৯৪২) এ সংস্কৃতি বলতে বুঝেছেন, ‘অতীতের শ্রেষ্ঠ ভাব-সম্পদের সমাহার।’ ফলে তাঁর সংস্কৃতি আর আবুল মনসুর আহমদের সভ্যতা কার্যত অভিন্ন। কিন্তু দুটোর মধ্যে পার্থক্য করে মনসুর এটা বোঝার রাস্তা খুলে দিয়েছেন যে জাতির ধারণার গোড়ায় থাকে একটি ‘এথনোস’ বা ‘কালচারাল নেশন’, আর সে কারণেই প্রতিটি নেশন স্বাতন্ত্র্য দাবি করতে পারে। 

সংস্কৃতি তাই একটি নির্দিষ্ট সমাজের করপোরেট পার্সোনালিটি। কালক্রমে এই কমিউনিটি একদিন জাতীয় সংস্কৃতিতে রূপান্তর হতে পারে এবং রাষ্ট্র হাসিল করার মাধ্যমে হতে পারে রাষ্ট্রীয় জাতি। তবে ‘এই রাষ্ট্রীয় জাতির পার্সোন্যালিটি বা কালচার’ একাধিক হওয়া সম্ভব। উদাহরণ: যুক্ত পাকিস্তানের দুই ডানা পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান একই রাষ্ট্রীয় নেশনের শরিক হলেও তাদের ছিল ‘স্বতন্ত্র কর্পোরেট পার্সোন্যালিটি’। সংস্কৃতির এই অর্থের ওপর দাঁড়িয়েই মনসুর ঘোষণা করেন, পাক-বাংলার কালচার আর ‘গোটা বাংলার কালচার’ আলাদা বস্তু। প্রকৃত প্রস্তাবে, ‘বাংলায় কোনও জাতীয় কালচার নাই’; আর জাতীয় কালচার গড়ে না ওঠার কারণ হিন্দু-মুসলিম দুই সমাজের বিচ্ছিন্নতা।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি কলেজের স্নাতক শ্রেণির ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের নবীনবরণ উপলক্ষে গত সেপ্টেম্বরে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন করে কলেজ কর্তৃপক্ষ। তবে নবীনবরণে কনসার্ট হবে—এমন আপত্তি তুলে তা স্থগিতের দাবি জানায় জেলা কওমি ছাত্র ঐক্য পরিষদ। অনিশ্চয়তা কাটিয়ে ১৪ সেপ্টেম্বর নবীনবরণ শেষে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়। তাতে গানে গানে উচ্ছ্বাসে মাতেন কলেজের শিক্ষার্থীরা। কলেজের দক্ষিণ ক্যাম্পাস–সংলগ্ন নিয়াজ মুহম্মদ উচ্চবিদ্যালয় মাঠে

কিন্তু এ বিষয়ে মনসুরের বয়ানে একটা সৃষ্টিশীল দ্ব্যর্থকতা আছে। ‘বাংলার কোনও জাতীয় কালচার নাই’—এই সিদ্ধান্ত টেনে তিনি এবার দৃষ্টি দেন বাঙালি মুসলমানের সংস্কৃতির ইতিহাসে। মুসলমানরা তাদের সাড়ে ছয় শ বছরের শাসনে বাংলাকে দিয়েছিল ‘নিজস্ব জাতি-নাম, ভাষা ও সাহিত্য’, যার সবটাই শাহি-নবাবি কালচার ছিল না, বরং ছিল ‘একটা জাতীয় প্রাণ ও গণরূপ।’ এই গণরূপ ধরা পড়বে বাঙালি মুসলমান ধর্ম ও সমাজ-জীবনের সকল ক্ষেত্রে, নাচে-গানে, আর্টে-সাহিত্যে, দালানে-ইমারতে, যার সব ক্ষেত্রেই তারা একটি ‘উদার ও উন্নত কালচার গড়িয়া তুলিয়াছিল’। মনসুর বিস্তারিত হদিস দেন আর্টের নানা শাখায় বাঙালি মুসলমানের উৎকর্ষের। এটা জরুরি ছিল তাঁর জন্য; কারণ, কালচার নিছক একটা করপোরেট পার্সোনালিটি নয়; এটা কতখানি ঋদ্ধ, সেটাও কৃষ্টিগত ঐশ্বর্যের বিচারের একটি বড় মানদণ্ড।

মনসুর আরও লেখেন, এই কালচার ‘শুধু মুসলমানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে নাই। অমুসলমান বাংগালীর মধ্যেও পরিব্যাপ্ত হইয়াছিল।’ যুগের দাবিতে, দেশজ পরিবেশে, ‘ন্যাচারেল গ্রোথের মতোই সে কালচার ধীরে-সুস্থে গড়িয়া উঠিয়াছিল। এই জন্যই তা পাইয়াছিল জাতীয় রূপ।’ নবাগত ব্রিটিশ-রাজ হিন্দু-মুসলিম বিরোধ বাধানোর প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে এই প্রচলিত ভাষা-কৃষ্টি-সাহিত্যের বিরুদ্ধে হিন্দুদের উসকানি দেয়; যার ফলে, ‘প্রচলিত বাংলা যবানের সাথে সংস্কৃতীকৃত নব্য বংগ ভাষার সংঘাত বাধে।’ এখানে তিনি যে একটি প্রাক্​ব্রিটিশ প্রচলিত ঐতিহ্যের কথা কবুল করছেন—যেটা ছিল জাতীয়, যার প্রসার ছিল অর্গানিক—এই কবুলিয়ত অস্বস্তি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে তাঁর পূর্বতন ঘোষণার পাশে যে বাঙালির জাতীয় কালচার নেই। 

ঠিক যে ১৯৬৭ সালে তিনি যখন ঘোষণা করবেন রবীন্দ্রনাথ পূর্ব পাকিস্তানের বাংলাভাষীদের সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ নন, তখন তিনি এই বাবদেই তা করবেন যে বাঙালি সংস্কৃতি বস্তুটাই তো মেকি। তবে মনসুরকে পড়তে গিয়ে এটাও মনে রাখা দরকার যে যৌথ বাঙালি ঐতিহ্যের বিষয়ে তাঁর যে দ্ব্যর্থকতা, সেটা কোনো বিচ্ছিন্ন ব্যাপার নয়; বরং তাঁর চিন্তা-পদ্ধতিরই একটি ডায়ালেকটিক্যাল ধরন। তবে শুধু ১৯৬৭ সালে দেওয়া তাঁর বয়ান মনে রাখলে মনে হবে যে লেখার শুরুতে যে দুটি প্রস্তাব তোলা হয়েছিল, তার প্রথমটি (দেশের সীমানা এবং সংস্কৃতির সীমানা হবে অভিন্ন) আবুল মনসুর আহমদ মেনে নিয়েছেন।

দ্বিতীয় প্রস্তাবের বিষয়ে তাঁর অবস্থান খুব চটজলদি বলে ফেলা যাবে। ‘এন্ড অব বিট্রেয়াল’-এ তিনি লেখেন, ‘যে কোনো মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ স্বভাবতই তার সামাজিক এবং জাতীয় জীবনকে একটি ইসলামি গড়ন দেবে।’ পাক-বাংলার কালচার স্বভাবগত এবং গণতান্ত্রিক নিয়মেই হবে বাঙালি মুসলমানের কালচার। অর্থাৎ কোনো সমাজে সংখ্যালঘুর সংস্কৃতি যদি জাতীয় সংস্কৃতি হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে বুঝতে হবে যে সেখানে গণতন্ত্রের ঘাটতি রয়েছে।

৩

পাকিস্তান সৃষ্টির পরপরই, ১৯৪৮ সালে প্রখ্যাত বাঙালি মুসলমান ঐতিহাসিক আবু মহামেদ হবিবুল্লাহ ‘বাঙালী মুসলমানের সাংস্কৃতিক আত্মনিয়ন্ত্রণ’ শিরোনামে একটি প্রবন্ধ লেখেন। তাঁর প্রস্থানবিন্দু স্পষ্টভাবে আবুল মনসুর আহমদ থেকে আলাদা। মনসুরের কাছে যেখানে খোদ বাঙালি সংস্কৃতির অস্তিত্ব একটা প্রশ্নসাপেক্ষ ব্যাপার, সেখানে হবিবুল্লাহর বিচারে ভাষা ও জাতিগত ভিত্তিতে বাংলার ‘সাংস্কৃতিক সমজাতিত্ব (homogeneity)’ তর্কাতীত। প্রাক্​ইসলামি বাংলার সামাজিক ও ধর্মীয় পরিস্থিতির বৈচিত্র্যে ইসলাম কোনো সৃষ্টিছাড়া নতুনত্ব এনেছিল, এমন নয়। কিন্তু বাংলার ঐতিহাসিকেরা, যাঁরা ধর্ম বলতে কার্যত বুঝেছিলেন ‘অপর বিরোধী জীবনাদর্শ,’ তাঁদের মধ্যে হিন্দুরা বাংলার মুসলিম শাসনকে মনে করেছেন বিজাতীয় উপদ্রব; আর মুসলিমরা প্রাক্​ইসলামি বাংলাকে ভেবেছেন এক আইয়ামে জাহেলিয়াত। এই একপেশে ইতিহাস রচনার আবহের কারণেই ‘বাঙালির সংস্কৃতি সমতা লাভ করতে পারেনি’।

বাংলাদেশে যদি একটি ঐশ্বর্যময় সংস্কৃতি আমরা চাই, তাহলে দৈশিকতা বিলোপের চেষ্টা বা ছায়ার সঙ্গে যুদ্ধ করা—একটি পণ্ডশ্রম এবং ইসলামি সভ্যতার বিকাশের ইতিহাস সম্পর্কে মূর্খতার ইঙ্গিত

এ রকম নানা বাধাবিঘ্ন থাকলেও হবিবুল্লাহ যে বাঙালির একটি সংস্কৃতির ভবিষ্যৎ কল্পনা করতে চান, তার একটি প্রধান কারণ ‘বাঙালি মাত্র—কি হিন্দু কি মুসলমান, বহির্বঙ্গীয় সংস্কৃতির সঙ্গে অনাত্মীয়তা বোধ করে।’ কিন্তু কেমন ছিরি-ছাঁদ হবে এই সংস্কৃতির? বাংলাদেশে মুসলমান সংখ্যাগুরু। হবিবুল্লাহ যেন মনসুরের যুক্তির প্রতিধ্বনি করছেন: ‘গণতন্ত্রের নিয়মে এই সংখ্যাগরিষ্ঠ দলই রাষ্ট্রের ও সমাজের রূপ নির্ধারণ করে।’ এবং এই অর্থে বাংলার সংস্কৃতি হবে ‘মুসলমানের সংস্কতি’। কিন্তু সংস্কৃতি বলতে হবিবুল্লাহ যা বোঝেন, তাতে এই গণতান্ত্রিক আইন কালচারের বেলায় খাটবে না। তাঁর ভাষায়, ‘কালচার বা তাহ্​জীব ভোট নিয়ে নির্দিষ্ট হয় না। সমাজ-চেতনায় বহু শতাব্দীর অলক্ষ্য কিন্তু অমোঘ প্রভাব সংখ্যা গুরুত্বের জোরে ঘুচান বা সৃষ্টি করা যায় না।’ মনসুর যাকে বলেছিলেন ‘অর্গ্যানিক’, সেটার নাম এখানে ‘বহু শতাব্দীর অলক্ষ্য কিন্তু অমোঘ প্রভাব’। এই সংস্কৃতি একটা উত্তরাধিকার, দরকার মনে করলেই একে নতুন ছাঁদে গড়েপিটে নেওয়া যায় না।

হবিবুল্লাহ খেয়াল করেছেন যে ইসলামের একটি সর্বজনীন রূপ অধিষ্ঠিত করা মানে মুসলিম বিশ্বে দৈশিক জাতীয়তাবাদের অবসান। কিন্তু দৈশিকতার এই বিলুপ্তির কোনো ইতিহাস মুসলিম বিশ্বে নেই; আর নেই বলেই সেখানে “দেশোত্তর একরূপী ‘তাহ্​জীবের’ প্রবর্তন হয় নি।” হবিবুল্লাহ লিখছেন, যাকে আমরা মুসলিম সংস্কৃতি বলি, সেটা আসলে ‘বহু জাতি ও দেশের কালচার সমষ্টির মধ্যে’ যেসব অন্তর্নিহিত ঐক্য ছিল তাকে কেন্দ্র করে, রাষ্ট্রীয় আধিপত্যের শক্তিতে গড়ে ওঠা একটা “uniform” কাঠামো।’ কিন্তু রাষ্ট্রশক্তির বলে বলীয়ান এই কাঠামোও দৈশিকতাকে জয় করতে পারেনি। 

এ বিষয়ে তাঁর সাক্ষী ইবনে বতুতা স্বয়ং। হবিবুল্লাহ লিখছেন, চৌদ্দ শতকের মরক্কোর এই আরবি-ভাষী মুসলমান পরিব্রাজক ‘সমস্ত মুসলিম শাসিত দেশেই সাদরে বরিত হয়েছেন…কিন্তু বিভিন্ন দেশের জীবনাদর্শে ও প্রণালীতে তাঁর আরবি মন স্বাজাত্য অনুভব করেনি।’

মুসলিম দুনিয়ার ইতিহাস থেকে হবিবুল্লাহর শিক্ষা এটাই যে দৈশিকতা মুছে ফেলার চেষ্টা একটা অনর্থক বিভ্রম। দেশীয় সংস্কৃতির নাম যদি হয় বাঙালি সংস্কৃতি, তার সংশ্রব-ত্যাগ মুসলমানের জন্য কোনো কর্তব্য নয়। তবে বাঙালি কালচারের যে রূপ তাঁর সময়ে ছিল হেজেমনিক, সেখানে মুসলিম সংস্কৃতির ঐতিহাসিক সিলসিলা চাপা পড়ে গেছিল। একে সত্যিকারের বাঙালি করে তোলার জন্য দরকার বর্জন নয়, আহরণ। অর্থাৎ হিন্দুর ধর্মাশ্রিত বলে কীর্তনের চর্চা বাংলা সংগীত থেকে বর্জন করলে এর ঐশ্বর্যহানিই হবে। ‘হিন্দুর দান অস্বীকার করে নয়, তার সঙ্গে মুসলমানের দান যুক্ত হয়েই বাঙালী সংস্কৃতি সর্বাঙ্গীণ পুষ্টতা লাভ করবে।’ বাংলায় হিন্দুর সাংস্কৃতিক নেতৃত্ব চিরকাল ছিল না, তার প্রমাণ, হবিবুল্লাহ লিখছেন, রামমোহন রায়ের ফার্সী গ্রন্থ মুসলমানি পদ্ধতিতে “হামদ” ও “নাত” দিয়েই আরম্ভ করতে হয়েছে।’ এই হারানো নেতৃত্ব পুনরুদ্ধারের জন্য এবং বাংলার তাহ্​জীবে মুসলমানি আবহাওয়ার পুনরুদ্ধারের জন্য, ‘সর্বাগ্রে প্রয়োজন এই তাহ্​জীবের ধারক মুসলিম সাহিত্যের বাংলায় অনুবাদ ও তৎসম্বন্ধে গবেষণা।’

৪

কালচার একটি করপোরেট পার্সোনালিটি, তবে কালটিভেশন ছাড়া এখানে উৎকর্ষের আর কোনো পথ নেই। বাঙালি মুসলমান এই অনুশীলনের পথে দুটো মহাফেজখানা থেকে রসদ পেতে পারে—একটি ইসলামি সভ্যতা, অন্যটি বাংলায় হিন্দু-মুসলমানের যৌথ সংস্কৃতি। তর্কে-বিতর্কে যে কথাটা হারিয়ে যায় সেটা হলো, হিন্দুয়ানির ছোঁয়াচ বাঁচিয়ে চলার অর্থ অনেক ক্ষেত্রে হয়ে দাঁড়ায় দৈশিকতা বিলোপের অ্যালিবাই। বাংলাদেশে যদি একটি ঐশ্বর্যময় সংস্কৃতি আমরা চাই, তাহলে দৈশিকতা বিলোপের চেষ্টা বা ছায়ার সঙ্গে যুদ্ধ করা—একটি পণ্ডশ্রম এবং ইসলামি সভ্যতার বিকাশের ইতিহাস সম্পর্কে মূর্খতার ইঙ্গিত।

* তৈমুর রেজা: শিক্ষক, ইতিহাস ও দর্শন বিভাগ, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়

সূত্র: প্রথম আলো