|
| |
শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর, ২০২৬, ১৪ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

স্বত্ব © ২০২৬ গণমাধ্যম। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।

সর্বশেষঃ

‘হ্যান্ড অব গড’ থেকে শতাব্দীর সেরা গোল, জন্মদিনে ম্যারাডোনাকে স্মরণ

গণমাধ্যম ডেক্স

গণমাধ্যম ডেক্স

প্রকাশ : ৩০ অক্টোবর, ২০২৬, ১২:১৭ পিএম
৩০৩ পঠিত
‘হ্যান্ড অব গড’ থেকে শতাব্দীর সেরা গোল, জন্মদিনে ম্যারাডোনাকে স্মরণ
যুক্ত থাকুন
সর্বশেষ খবরের জন্য ফলো করুন:
ফুটবল মাঠে কিছু মুহূর্ত থাকে, যা সময়ের সঙ্গে পুরোনো হয় না। বরং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে নতুন করে আলোচনায় আসে। দিয়েগো আরমান্দো ম্যারাডোনার নাম উঠলে এমন দুটি মুহূর্তের কথা সবার আগে মনে পড়ে। একটি বিতর্কিত, অন্যটি অবিশ্বাস্য শৈল্পিক সৌন্দর্যে ভরপুর। ১৯৮৬ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে মাত...
ফুটবল মাঠে কিছু মুহূর্ত থাকে, যা সময়ের সঙ্গে পুরোনো হয় না। বরং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে নতুন করে আলোচনায় আসে। দিয়েগো আরমান্দো ম্যারাডোনার নাম উঠলে এমন দুটি মুহূর্তের কথা সবার আগে মনে পড়ে। একটি বিতর্কিত, অন্যটি অবিশ্বাস্য শৈল্পিক সৌন্দর্যে ভরপুর। ১৯৮৬ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে মাত্র চার মিনিটের ব্যবধানে করা সেই দুই গোলই ফুটবল ইতিহাসে চিরস্থায়ী জায়গা করে নিয়েছে। আজ ৩০ অক্টোবর, এই কিংবদন্তি আর্জেন্টাইন ফুটবলারের জন্মদিন। ১৯৬০ সালের এই দিনে আর্জেন্টিনার বুয়েনস এইরেসের কাছে জন্ম নেওয়া ম্যারাডোনা বেঁচে থাকলে আজ ৬৬ বছরে পা দিতেন। ২০২০ সালের ২৫ নভেম্বর পৃথিবী ছেড়ে গেলেও ফুটবলপ্রেমীদের স্মৃতিতে তিনি আজও জীবন্ত। তার পায়ের জাদু, প্রতিপক্ষকে বোকা বানানোর অসাধারণ দক্ষতা আর মাঠে নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতা তাকে সর্বকালের সেরাদের কাতারে জায়গা দিয়েছে। চার মিনিটে দুই ইতিহাস ১৯৮৬ সালের ২২ জুন। মেক্সিকো বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে মেক্সিকো সিটির অ্যাজটেকা স্টেডিয়ামে মুখোমুখি আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ড। ম্যাচটি শুধু ফুটবলের লড়াই ছিল না, ফকল্যান্ড যুদ্ধের ক্ষত তখনো দুই দেশের মানুষের মনে তাজা। সেই আবহে মাঠের লড়াই পেয়েছিল বাড়তি মাত্রা। দ্বিতীয়ার্ধের ষষ্ঠ মিনিটে ইংল্যান্ডের গোলরক্ষক পিটার শিলটনের সঙ্গে বলের দখল নিতে লাফ দেন ম্যারাডোনা। তবে মাথার বদলে বাঁ হাত দিয়ে বল জালে পাঠান তিনি। গোলটি বৈধ মনে করে রেফারি আলি বিন নাসের সেটি অনুমোদন করেন। ইংল্যান্ডের খেলোয়াড়রা প্রতিবাদ করলেও সিদ্ধান্ত বদলায়নি। পরে এই গোলের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে ম্যারাডোনা বলেছিলেন, বলটি তার মাথার সামান্য অংশ এবং ঈশ্বরের হাতের স্পর্শে জালে গিয়েছিল। সেখান থেকেই গোলটির নাম হয়ে যায় ‘হ্যান্ড অব গড’ বা ‘ঈশ্বরের হাত’। গোলটি যেমন আর্জেন্টিনাকে এগিয়ে দিয়েছিল, তেমনি জন্ম দিয়েছিল বিতর্কের। বহু বছর পরও বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে আলোচিত গোলগুলোর তালিকায় এর নাম থাকে। ভিডিও প্রযুক্তি বা ভিএআর থাকলে গোলটি বাতিল হতো, এ কথাও পরে স্বীকার করেছিলেন ম্যারাডোনা। তবে সেদিন তার জাদুর আসল প্রদর্শনী তখনো বাকি ছিল প্রথম গোলের মাত্র চার মিনিট পর, ম্যাচের ৫৫ মিনিটে নিজেদের অর্ধ থেকে বল নিয়ে এগিয়ে যান ম্যারাডোনা। একের পর এক ইংলিশ খেলোয়াড়কে কাটিয়ে তিনি ঢুকে পড়েন প্রতিপক্ষের পেনাল্টি বক্সে। এরপর গোলরক্ষক শিলটনকেও পরাস্ত করে বল পাঠিয়ে দেন জালে। প্রতিপক্ষের একাধিক খেলোয়াড়কে কাটিয়ে প্রায় ৬০ মিটার দূরত্ব অতিক্রম করে মাত্র কয়েক সেকেন্ডে করা গোলটি পরে ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’ হিসেবে পরিচিতি পায়। ফিফার বর্ণনায়, এটি বিশ্বকাপের ইতিহাসে অন্যতম সেরা ব্যক্তিগত নৈপুণ্যের নিদর্শন। দুটি গোল যেন ম্যারাডোনার দুই বিপরীত পরিচয়কে তুলে ধরে। প্রথমটি তাকে বিতর্কের কেন্দ্রে রেখেছে, দ্বিতীয়টি তাকে দিয়েছে ফুটবলীয় মহত্ত্বের অনন্য স্বীকৃতি। শেষ পর্যন্ত ম্যাচটি আর্জেন্টিনা জেতে ২-১ গোলে। ইংল্যান্ডের হয়ে গ্যারি লিনেকার একটি গোল করলেও তা যথেষ্ট ছিল না। সেদিনের ম্যাচে ম্যারাডোনার অবদান কেবল গোলসংখ্যায় সীমাবদ্ধ ছিল না; পুরো খেলায় তার প্রভাব ছিল অসাধারণ। মেক্সিকোতে ম্যারাডোনার বিশ্বজয় ১৯৮৬ বিশ্বকাপ ছিল ম্যারাডোনার ক্যারিয়ারের সেরা অধ্যায়। অধিনায়ক হিসেবে আর্জেন্টিনাকে বিশ্বকাপ জেতানোর পথে তিনি ছিলেন দলের প্রধান চালিকাশক্তি। তার গোল, সতীর্থদের দিয়ে গোল করানোর ক্ষমতা এবং প্রতিপক্ষের রক্ষণ ভেঙে দেওয়ার দক্ষতা আর্জেন্টিনাকে এনে দেয় বিশ্বসেরার মুকুট। পরিসংখ্যান বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান অপ্টার হিসাবে, ওই আসরে আর্জেন্টিনার করা ১৪টি গোলের ১০টিতেই সরাসরি অবদান ছিল ম্যারাডোনার, গোল করে কিংবা সতীর্থকে দিয়ে গোল করিয়ে। পুরো টুর্নামেন্টে তিনি ৫টি গোল করেন এবং ৫টি গোলে সহায়তা করেন। এক আসরে গোল ও গোলে সহায়তা, দুই ক্ষেত্রেই ৫ বা তার বেশি অবদান রাখা বিশ্বকাপের ইতিহাসে তার অনন্য কীর্তি। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালের পর সেমিফাইনালেও বেলজিয়ামের বিপক্ষে দুটি গোল করেন তিনি। ফাইনালে পশ্চিম জার্মানির বিপক্ষে নিজে গোল না পেলেও জর্জে বুরুচাগার জয়সূচক গোলে সহায়তা করেন। আর্জেন্টিনা ৩-২ গোলে জিতে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ শিরোপা উঁচিয়ে ধরে। ম্যারাডোনার জন্য এটি ছিল ব্যক্তিগত শ্রেষ্ঠত্বের পাশাপাশি জাতীয় গৌরবেরও মুহূর্ত। বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড় হিসেবে গোল্ডেন বলও জেতেন তিনি। ছোটবেলা থেকেই প্রতিভার ঝলক ম্যারাডোনার ফুটবলযাত্রা শুরু হয়েছিল আর্জেন্টিনার দরিদ্র পরিবারে বেড়ে ওঠার মধ্য দিয়ে। মাত্র ৮ বছর বয়সে তিনি আর্জেন্টিনোস জুনিয়র্সের যুব দল লস সেবোলিতাসে যোগ দেন। সেখানেই তার অসাধারণ প্রতিভা সবার নজর কাড়ে। মাত্র ১৫ বছর বয়সে পেশাদার ফুটবলে অভিষেক হয় তার। এরপর বোকা জুনিয়র্স, বার্সেলোনা ও নাপোলির হয়ে খেলেছেন তিনি। বিশেষ করে নাপোলিতে তার সময়ে ক্লাবটির ইতিহাস বদলে যায়। ১৯৮৪ সালে নাপোলিতে যোগ দেওয়ার পর ক্লাবটিকে ১৯৮৬-৮৭ ও ১৯৮৯-৯০ মৌসুমে ইতালির শীর্ষ লিগ সিরি আ জেতাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন ম্যারাডোনা। ১৯৮৭ সালে কোপা ইতালিয়াও জেতে নাপোলি। ইতালির ফুটবলে ঐতিহ্যগতভাবে শক্তিশালী ক্লাবগুলোর আধিপত্যের মধ্যে নাপোলিকে সাফল্যের শিখরে তুলে নেওয়ায় তিনি হয়ে ওঠেন শহরটির মানুষের আবেগের অংশ। আর্জেন্টিনায় ফিরে বোকা জুনিয়র্সের হয়েও খেলেছেন তিনি। পরে ১৯৯৭ সালে পেশাদার ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণা দেন তিনি। বিতর্কের আড়ালেও যে কিংবদন্তি ম্যারাডোনার জীবন কেবল সাফল্য আর গৌরবের গল্প নয়। মাঠের বাইরের নানা বিতর্ক, মাদকাসক্তির সঙ্গে লড়াই এবং শারীরিক অসুস্থতা তার জীবনকে বারবার কঠিন করে তুলেছে। ১৯৯১ সালে কোকেন পরীক্ষায় পজিটিভ হওয়ার পর ১৫ মাসের নিষেধাজ্ঞা পান তিনি। ১৯৯৪ বিশ্বকাপেও নিষিদ্ধ পদার্থের পরীক্ষায় পজিটিভ হওয়ার কারণে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নিতে হয় তাকে। খেলোয়াড়ি জীবন শেষে কোচ হিসেবেও আর্জেন্টিনা জাতীয় দলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন ম্যারাডোনা। ২০১০ বিশ্বকাপে তার অধীনে কোয়ার্টার ফাইনালে জার্মানির কাছে ৪-০ গোলে হেরে বিদায় নেয় আর্জেন্টিনা। তবু এসব বিতর্ক তার ফুটবলীয় অর্জনকে মুছে দিতে পারেনি। আর্জেন্টিনার মানুষের কাছে তিনি ছিলেন এমন এক নায়ক, যিনি সাধারণ পরিবার থেকে উঠে এসে বিশ্বমঞ্চে দেশের নাম উজ্জ্বল করেছিলেন। নাপোলির সমর্থকদের কাছেও তার অবস্থান বিশেষ। আজও শহরটির ফুটবল সংস্কৃতিতে তার নাম গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। ২০২০ সালের ২৫ নভেম্বর হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়ে ৬০ বছর বয়সে মারা যান ম্যারাডোনা। তার মৃত্যুর পরও বিশ্বজুড়ে ফুটবলপ্রেমীরা তাকে স্মরণ করে আসছেন। বিশেষ করে ১৯৮৬ বিশ্বকাপের সেই দুটি গোল বারবার মনে করিয়ে দেয়, ফুটবল কখনো কখনো একজন খেলোয়াড়ের প্রতিভা, সাহস, বিতর্ক আর সৌন্দর্যকে এক মুহূর্তে ধারণ করতে পারে। ফুটবল যত দিন, ম্যারাডোনা তত দিন ম্যারাডোনাকে ঘিরে বিতর্কের শেষ নেই। কেউ তাকে ঈশ্বরপ্রদত্ত প্রতিভার প্রতীক মনে করেন, কেউ মনে করিয়ে দেন তার ভুল ও সীমাবদ্ধতার কথা। কিন্তু একটি বিষয়ে দ্বিমত করা কঠিন, ফুটবলের ইতিহাসে তার প্রভাব অনস্বীকার্য। ‘হ্যান্ড অব গড’ গোলটি যেমন ফুটবলের নিয়ম, নৈতিকতা ও প্রযুক্তি নিয়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে, তেমনি ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’ প্রমাণ করেছে বল পায়ে একজন মানুষের কল্পনাশক্তি কত দূর যেতে পারে। আজ তার জন্মদিনে তাই ম্যারাডোনাকে স্মরণ করা মানে শুধু একজন বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ককে স্মরণ করা নয়, স্মরণ করা ফুটবলের এমন এক শিল্পীকে, যার প্রতিভা মাঠের সীমানা ছাড়িয়ে কিংবদন্তিতে পরিণত হয়েছে। সময় বদলাবে, নতুন তারকারা আসবেন, নতুন গোল ইতিহাস গড়বে, তবু ম্যারাডোনার বাঁ পায়ের জাদু ফুটবলপ্রেমীদের মনে চিরকাল অমলিন থাকবে।

সূত্র: নতুন আরএসএস সোর্স