|
| |
শনিবার, ৩১ অক্টোবর, ২০২৬, ১৫ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

স্বত্ব © ২০২৬ গণমাধ্যম। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।

সর্বশেষঃ

ছাগল খুঁজতে গিয়ে চিতাবাঘের সামনে শরীফা, লাঠিসোঁটা নিয়ে জড়ো হাজারো মানুষ

গণমাধ্যম ডেক্স

গণমাধ্যম ডেক্স

প্রকাশ : ৩১ অক্টোবর, ২০২৬, ০৪:২০ এএম
৪৫০ পঠিত
ছাগল খুঁজতে গিয়ে চিতাবাঘের সামনে শরীফা, লাঠিসোঁটা নিয়ে জড়ো হাজারো মানুষ
যুক্ত থাকুন
সর্বশেষ খবরের জন্য ফলো করুন:
প্রতিদিনের মতো গোচারণভূমি থেকে বাড়ি ফিরেছিল ছাগলের পাল, পরে খোঁজ নিয়ে জানা যায়- সেখানে নিখোঁজ ছিল একটি ছাগল। আর সেই ছাগলের খোঁজে সীমান্ত এলাকায় গিয়ে চিতাবাঘের মুখোমুখি হন শরীফা বেগম। মুহূর্তেই তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে বন্য প্রাণীটি। এ সময় তাকে বাঁচাতে গিয়ে আহত হন আরও দুজন।  লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেল...

প্রতিদিনের মতো গোচারণভূমি থেকে বাড়ি ফিরেছিল ছাগলের পাল, পরে খোঁজ নিয়ে জানা যায়- সেখানে নিখোঁজ ছিল একটি ছাগল। আর সেই ছাগলের খোঁজে সীমান্ত এলাকায় গিয়ে চিতাবাঘের মুখোমুখি হন শরীফা বেগম। মুহূর্তেই তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে বন্য প্রাণীটি। এ সময় তাকে বাঁচাতে গিয়ে আহত হন আরও দুজন। 

লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলার আমঝোল সীমান্তে এ ঘটনার পর এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে আতঙ্ক। বাঘটি ধরতে পাঁচটি সীমান্তবর্তী ইউনিয়নে তল্লাশি চালিয়েও সন্ধান পায়নি বন বিভাগের বিশেষ দল। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, চিতাবাঘটি এরই মধ্যে সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে ফিরে গেছে।

গত ২৫ অক্টোবর বিকালে লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলার গোতামারী ইউনিয়নের আমঝোল সীমান্তে ঘটনাটি ঘটে। ওই দিনই ঢাকার বন বিভাগের বন্য প্রাণী অপরাধ দমন ইউনিটের চার সদস্যের একটি দল ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। চিতাবাঘটির সন্ধানে বিস্তীর্ণ এলাকায় তল্লাশি চালিয়েও কোনো হদিস না পেয়ে শুক্রবার ঢাকায় ফিরে আসে দলটি।

বন বিভাগের সদস্যদের ধারণা, চিতাবাঘটি ইতিমধ্যে ভারতে ফিরে গেছে। বন্য প্রাণী অপরাধ দমন ইউনিটের বন্য প্রাণী পরিদর্শক আবদুল্লাহ আস সাদিক দলটির অন্যতম সদস্য। তিনি  বলেন, আমঝোল গ্রামের বাসিন্দা শরীফা বেগমের ছয়টি ছাগল ছিল। 

এর মধ্যে একটি ছাগল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। সেটির সন্ধানে বেরিয়েই চিতাবাঘের সামনে পড়ে যান তিনি।

সাদিক জানান, চিতাবাঘের আক্রমণে ছাগলটি মারা গেছে। পায়ের ছাপ এবং ছাগলের শরীরে কামড়ের গভীরতা পরীক্ষা করে তারা নিশ্চিত হয়েছেন, এটি চিতাবাঘের আক্রমণ। সীমান্তের বাংলাদেশ অংশে স্থানীয় লোকজন গরু ও ছাগল চরাতে দেন।

ডুয়ার্স কিংবা বক্সারের বন থেকে আসতে পারে চিতাবাঘ

বন্য প্রাণী পরিদর্শক আবদুল্লাহ আস সাদিকের ধারণা, ভারতের ডুয়ার্স অথবা বক্সারের বনাঞ্চল থেকে চিতাবাঘটি সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে।

তিনি বলেন, আমঝোল সীমান্তের ভারতীয় অংশে রয়েছে শালবন, বাঁশঝাড় ও বিস্তীর্ণ ধানক্ষেত। এ ছাড়া সীমান্তের কাছাকাছি ভারতের দুটি সংরক্ষিত বন রয়েছে। একটি ডুয়ার্স, অন্যটি বক্সার। এ অঞ্চল ভারতীয় চিতাবাঘের প্রধান আবাসস্থল।

সাদিকের ভাষ্য অনুযায়ী, সীমান্তে যেভাবে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়া হয়েছে, তাতে স্বাভাবিকভাবে বাঘের প্রবেশের সুযোগ নেই। তবে ভারতীয় অংশে সীমান্তের কাছাকাছি বেশ কিছু বড় সেগুন ও শিমুলগাছ রয়েছে। চিতাবাঘ অত্যন্ত ক্ষিপ্রতার সঙ্গে গাছে উঠতে পারে। তার ধারণা, বাঘটি কোনো একটি গাছ বেয়ে উঠে কাঁটাতারের বেড়ার ওপর লাফ দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে।

পাঁচ ইউনিয়নে তল্লাশি, থার্মাল ড্রোনে শনাক্ত অবস্থান

ঢাকা থেকে যাওয়া বন বিভাগের চার সদস্যের দলের কার্যক্রম তদারক করছিলেন বন্য প্রাণী অপরাধ দমন ইউনিটের প্রধান বন সংরক্ষক মোহাম্মদ মিজানুর রহমান।

তিনি বলেন, বিজিবির সহায়তায় গোতামারীসহ সীমান্তঘেঁষা পাঁচটি ইউনিয়নে তল্লাশি চালানো হয়েছে। স্থানীয় মানুষকে সতর্ক করতে মাইকিংও করা হয়েছে। সর্বশেষ বিজিবির থার্মাল ড্রোনের মাধ্যমে চিতাবাঘটির অবস্থান সীমান্তের কাছাকাছি শনাক্ত করা হয়। পরে প্রাণীটি সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতের বনে চলে গেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

মিজানুর রহমান আরও বলেন, এর আগেও ওই অঞ্চলে মাঝেমধ্যে সীমান্ত পেরিয়ে চিতাবাঘ আসার ঘটনা ঘটেছে।

বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চিতাবাঘ সাধারণত তিস্তা ও ধরলা নদীর অববাহিকা, চা-বাগান এবং উঁচু ফসলের খেত ধরে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে পারে। খাবারের সন্ধানে কিংবা নিজের আবাসস্থল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নতুন এলাকার খোঁজে এরা মাঝেমধ্যে উঁচু গাছ বেয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে।

বাঘ পিটিয়ে মারতে জড়ো হন হাজারো মানুষ

চিতাবাঘের আক্রমণে তিনজন আহত হওয়ার পর আমঝোল এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। রংপুর বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২৫ অক্টোবর ঘটনাটির পর হাজার হাজার মানুষ বাঘটিকে পিটিয়ে মারার উদ্দেশ্যে লাঠিসোঁটা নিয়ে জড়ো হন।

এ পরিস্থিতিতে উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণ এবং চিতাবাঘটিকে নিরাপদে ফিরে যাওয়ার সুযোগ করে দিতে বিজিবি ফাঁকা গুলি ছোড়ে। পরে রাতে বিজিবির থার্মাল ড্রোনের মাধ্যমে সীমান্তের কাছে বাঘটির অবস্থান শনাক্ত করা হয়।

প্রাণীটিকে নিরাপদে উদ্ধারের উদ্দেশ্যে রংপুর সামাজিক বন বিভাগ ওই দিনই স্থানীয় বনকর্মীদের ঘটনাস্থলে সারা রাত পাহারায় রাখে।

বন্য প্রাণী দেখলেই হত্যার প্রবণতা নিয়ে উদ্বেগ

বন্য প্রাণী বিশেষজ্ঞ রেজা খান বলেন, লালমনিরহাট, পঞ্চগড়সহ সীমান্তবর্তী এলাকায় চিতাবাঘের আগমন অস্বাভাবিক নয়। কয়েক বছর আগেও পঞ্চগড়ে একটি চিতাবাঘকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছিল।

বন্য প্রাণী সম্পর্কে মানুষের অসচেতনতা ও অসংবেদনশীলতার বিষয়টি তুলে ধরে রেজা খান বলেন, ‘বন্য প্রাণী নিয়ে আমাদের মধ্যে কোনো সংবেদনশীলতা তৈরি হয়নি। কারণ, ছোটবেলা থেকে এসব বিষয় নিয়ে আমাদেরকে সংবেদনশীল করে তোলার মতো কোনো ব্যবস্থা নেই। ফলে, সামাজিকভাবে আমরা বন্য প্রাণীবিমুখ হয়ে পড়েছি। কোনো নীলগাই, হরিণ, চিতা এমনকি একটি ছোট বনবিড়াল দেখলেও সবাই লাঠিসোঁটা নিয়ে হত্যা করতে নেমে যায়।’

তিনি মনে করেন, বন্য প্রাণী লোকালয়ে চলে এলে কীভাবে আগাম সতর্কবার্তা দেওয়া যায়, সে বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা খুঁজে বের করা প্রয়োজন।

আমঝোল সীমান্তে চিতাবাঘের আগমন ও মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়া আতঙ্কের ঘটনা আবারও বন্য প্রাণী সংরক্ষণ এবং মানুষ-বন্য প্রাণীর সহাবস্থান নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা সামনে এনেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, লোকালয়ে বন্য প্রাণী দেখা গেলে আতঙ্কিত হয়ে আক্রমণ না করে সংশ্লিষ্ট বন বিভাগ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে খবর দেওয়া জরুরি।

সূত্র: নতুন আরএসএস সোর্স