বাংলাদেশের ইসলামী রাজনীতি: সংকট, সংস্কার ও সময়ের দাবি
গণমাধ্যম ডেক্স
পৃথিবীর ইতিহাসে এমন কোনো প্রভাবশালী ও স্থায়ী রাজনৈতিক শক্তির অস্তিত্ব পাওয়া যাবে না, যা সামরিক কৌশল, অর্থনৈতিক ভিত্তি এবং সামাজিক ভিত্তি ছাড়া টিকে থেকেছে। ইতিহাসের সফল রাজনৈতিক সুলতান ও শাসকগণের প্রত্যেকেই কেবল তাত্ত্বিক ছিলেন না, ছিলেন বাস্তবমুখী সমরবিদ ও কৌশলবিদ।
দু-জাহানের সরদার মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) এবং পরবর্তী খোলাফায়ে রাশেদীন (রা.) কেবল ধর্মীয় ও প্রশাসনিক নেতাই ছিলেন না, তাঁরা ছিলেন সমকালীন শ্রেষ্ঠ সমর বিশেষজ্ঞ। অথচ আজ আমাদের দেশের ইসলামী রাজনীতির দিকে তাকালে এক চরম বৈপরীত্য ও অপেশাদারিত্ব চোখে পড়ে।
ধর্মীয় রাজনীতি এবং আকাবীর-আসলাফের আমানত বহন করার দাবি করবেন, আর ন্যূনতম কৌশলগত শক্তি, বাহুবল বা শত্রুর টার্গেট ও ঝুঁকি মোকাবেলার প্রস্তুতি রাখবেন না—তা হতে পারে না।
আমাদের ঐতিহাসিক শিকড় কিন্তু দুর্বলতার শিক্ষা দেয় না। নিকট অতীতে ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহ, শামেলীর যুদ্ধ, কিংবা বালাকোটের লড়াই—এসব বিপ্লব তো ভিনদেশী বা কেবল বই-পুস্তক পড়ে থাকা মানুষেরা করেননি; রক্ত ও ঘাম দিয়ে তৈরি এই ইতিহাস আমাদেরই আকাবীরদের দান। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সামরিক সামর্থ্য কেবল সৈন্য সংখ্যা বা অস্ত্রের ওপর নির্ভর করত না; এর মূলে ছিল অদম্য মনোবল, দূরদর্শী নেতৃত্ব এবং আসমানের মালিকের ওপর সুদৃঢ় তাওয়াক্কুল।
আজকের ইসলামী রাজনীতির মূল সংকটগুলো চিহ্নিত করা এবং সেখান থেকে উত্তরণের উপায় খোঁজা অত্যন্ত জরুরি:
১. মূলধারা ও জনবিচ্ছিন্নতা
বাইতুল মোকাররমের উত্তর গেট, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান বা শাপলা চত্বরের মাহফিল কাঁপানো শ্রোতাদের করতালি দেখে নিজেদের ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রনেতা ভাবার দিন শেষ। কেবল ইলম বা ধর্মীয় জ্ঞান দিয়ে কোনো জাতির সামগ্রিক মুক্তি আসতে পারে না। রাজনৈতিক শক্তি অর্জন না করে, সাধারণ জনগণের সুখ-দুঃখে না মিশে এবং জনবান্ধব কর্মসূচি না দিয়ে কেবল মাদ্রাসার ছাত্র-শিক্ষকদের ওপর নির্ভর করে কোনো ইসলামী সুশাসন কায়েম সম্ভব নয়। ১৯৪৭ পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের ইসলামী রাজনীতি কেন গণমুখী হতে পারল না এবং এখনো কেন ইসলামী দলগুলোর ৯০%-এর বেশি জনবল কেবল মাদ্রাসা-কেন্দ্রিক—এই প্রশ্নটির আত্মসমালোচনা প্রয়োজন।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সাহাবাদের সমাজ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সেখানে ধনকুবের ছিলেন, সাধারণ ব্যবসায়ী ছিলেন, আবার দরিদ্র সাহাবীও ছিলেন। রাসুল (সা.) ছিলেন সবার লিডার, সর্বজনীন জননেতা। বাংলাদেশ যেভাবে চলছে, এভাবে চললে আগামী ২০০ বছরেও এই রাজনৈতিক ধারা জাতির মূলস্রোতে মিশতে পারবে না এবং তাদের সমর্থন ওই ২-৩ শতাংশের বৃত্তেই আটকা পড়ে থাকবে।
২. রাজনৈতিক দূরদর্শিতার অভাব ও ব্যবহার হওয়া
কৌশলগত রাজনীতির গভীরতা না বোঝার কারণে দেশের ভোগবাদী ও ধর্মনিরপেক্ষ দলগুলো অতীতে বারবার ইসলামী জনশক্তিকে রাজপথের আন্দোলন ও ইস্যুভিত্তিক কাজে নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করেছে। কাজের কাজ শেষে ইসলামী শক্তিগুলোকে ছিবড়ের মতো ছুড়ে ফেলা হয়েছে। এই ব্যবহার হওয়ার চক্র বন্ধ করতে হলে নিজেদের স্বতন্ত্র রাজনৈতিক পরিপক্বতা নিশ্চিত করতে হবে।
৩. শিক্ষাব্যবস্থার আধুনিকায়ন ও ‘দরসে নেজামী’ সংস্কার
আজকের ‘ফাইভ-জি’ এবং এআই-এর যুগে ১০০ বছর আগের কারিকুলাম দিয়ে আধুনিক রাষ্ট্র পরিচালনার স্বপ্ন দেখা এক ধরনের অলীক চিন্তা। দেওবন্দের প্রতিষ্ঠাতা শাইখুল হিন্দ মাহমুদুল হাসান (রহ.) ও কাসেম নানুতুবী (রহ.) তাদের সমসাময়িক যুগের প্রয়োজন অনুধাবন করে দরসে নেজামি সংস্কার করেছিলেন। আজ ইমান-আকাইদ ঠিক রেখে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একটি আধুনিক, বিজ্ঞানমনস্ক ও সময়োপযোগী সিলেবাস প্রণয়ন করা যুগের সবচেয়ে বড় দাবি।
৪. বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট ও সামরিক-কৌশলগত শিক্ষা
তালেবান ও ইরান দৃষ্টান্ত: আফগান তালেবানরা বহুপাক্ষিক কূটনৈতিক প্রজ্ঞা ও সামরিক শক্তিমত্তার সমন্বয়ে যে রাজনৈতিক দূরদর্শিতা দেখিয়েছে, তা সমকালীন ইতিহাসে বিরল। অন্যদিকে ইরান তার স্বীয় ভূ-রাজনৈতিক ও সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে বিশ্বমঞ্চে নিজেদের অবস্থান এমনভাবে তৈরি করেছে যে, বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলো তাদের সাথে হিসাব করে কথা বলতে বাধ্য হয়।
আমাদের বাস্তবতা: আমরা এখনো মনে করি প্রতি জুমার পর একটা বিক্ষোভ মিছিল আর কয়েকটি চটকদার বক্তব্য দিয়েই বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা ও দায়িত্ব আনজাম দেওয়া সম্ভব। এ ধারণা থেকে বের হয়ে আসতে হবে।
৫. অনাগত সংকট ও ভবিষ্যৎ প্রস্তুতি
সময় দ্রুত বদলে যাচ্ছে। বিশ্ব এখন এক জটিল ভূ-রাজনৈতিক টানাপোড়েন, অর্থনৈতিক মন্দা, কৃত্রিম খাদ্য সংকট এবং জাতিগত সংঘাতের মুখোমুখি। এই চরম সংকটময় সময়ে মানুষের ইমান ও জীবন রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়বে। কারণ দুর্বল কোনো সত্ত্বা কখনো তার নিজস্ব স্বকীয়তা ও নীতি ধরে রাখতে পারে না; সামান্য প্রলোভন বা চাপের মুখে নতি স্বীকার করতে বাধ্য হয়।
অতএব, দেশের ইসলামী দলগুলোর নেতাদের কেবল আবেগ ও স্লোগানভিত্তিক রাজনীতি ত্যাগ করে কৌশলগত পূর্বপ্রস্তুতি, আধুনিক শিক্ষা, সর্বজনীন জনসম্পৃক্ততা এবং অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক সামর্থ্য অর্জনে মনোযোগী হতে হবে। সময়ের সাথে পরিবর্তন ও আধুনিকায়ন না হলে ইতিহাস কাউকেই ক্ষমা করবে না।
লেখক: আলেম, রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী
সূত্র: নতুন আরএসএস সোর্স