|
| |
সোমবার, ০২ নভেম্বর, ২০২৬, ১৭ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

স্বত্ব © ২০২৬ গণমাধ্যম। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।

সর্বশেষঃ

চট্টগ্রামে যৌতুকের বলিদানে ঝরে যাচ্ছে একের পর এক নারীর প্রাণ

গণমাধ্যম ডেক্স

গণমাধ্যম ডেক্স

প্রকাশ : ০২ নভেম্বর, ২০২৬, ১০:২৩ এএম
৩৫৮ পঠিত
চট্টগ্রামে যৌতুকের বলিদানে ঝরে যাচ্ছে একের পর এক নারীর প্রাণ
যুক্ত থাকুন
সর্বশেষ খবরের জন্য ফলো করুন:
যৌতুক প্রথা নির্মূলে কঠোর আইন প্রণয়ন এবং চার দশকেরও বেশি সময় ধরে সচেতনতামূলক প্রচার চালানো হলেও এ সামাজিক ব্যাধি থেকে মুক্ত হতে পারেনি বাংলাদেশ। বিশেষ করে চট্টগ্রাম অঞ্চলজুড়ে বিয়েকে কেন্দ্র করে প্রকাশ্যে-গোপনে চলছে অর্থ ও সম্পদের দরকষাকষি। সমাজের উচ্চবিত্ত থেকে নিম্নবিত্ত বিভিন্ন শ্রেণির পরিবারে জাঁ...

যৌতুক প্রথা নির্মূলে কঠোর আইন প্রণয়ন এবং চার দশকেরও বেশি সময় ধরে সচেতনতামূলক প্রচার চালানো হলেও এ সামাজিক ব্যাধি থেকে মুক্ত হতে পারেনি বাংলাদেশ। বিশেষ করে চট্টগ্রাম অঞ্চলজুড়ে বিয়েকে কেন্দ্র করে প্রকাশ্যে-গোপনে চলছে অর্থ ও সম্পদের দরকষাকষি। সমাজের উচ্চবিত্ত থেকে নিম্নবিত্ত বিভিন্ন শ্রেণির পরিবারে জাঁকজমকপূর্ণ উপহার কিংবা সরাসরি অর্থ দাবির আড়ালে বিস্তার লাভ করছে যৌতুকের চর্চা। প্রত্যাশিত অর্থ ও সামগ্রী না পেলেই অনেক ক্ষেত্রে নববধূর ওপর নেমে আসে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। কখনো সেই নির্যাতনের পরিণতি হয় মৃত্যু।

সাম্প্রতিক সময়ে চট্টগ্রামের পটিয়ায় যৌতুক ও পারিবারিক নির্যাতনের অভিযোগে পরপর দুই অন্তঃসত্ত্বা গৃহবধূর মৃত্যুর ঘটনায় নতুন করে সামনে এসেছে এ সংকট। একজন ছিলেন তিন মাসের, অন্যজন নয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা। দুটি ঘটনাতেই শ্বশুরবাড়িতে নির্যাতনের অভিযোগ তুলেছে নিহতদের পরিবার। তাদের অভিযোগ, বিয়ের পর থেকেই নানা অজুহাতে অর্থ, আসবাব ও উপহার দাবি করা হতো। দাবি পূরণ না হওয়ায় নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে তাঁদের।

উপহার ও সামাজিক মর্যাদার আড়ালে যৌতুকের নতুন বাণিজ্য

চট্টগ্রামে যৌতুক এখন কেবল সনাতন পদ্ধতিতে নগদ টাকা কিংবা স্বর্ণালংকারের দাবিতে সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ঈদ ও বিভিন্ন উৎসবে বিপুল পরিমাণ উপহার, দামি আসবাব, মোটরসাইকেল, গাড়ি, এমনকি বিদেশযাত্রা ও ব্যবসার জন্য মোটা অঙ্কের মূলধন চাওয়ার প্রবণতা। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য কিংবা অন্য দেশে থাকা স্বামীদের ভিসা, বিদেশযাত্রা বা ব্যবসার খরচ জোগাতে স্ত্রীর পরিবারের ওপর চাপ সৃষ্টির অভিযোগও রয়েছে।

উচ্চবিত্ত সমাজে এসব দাবিকে সরাসরি ‘যৌতুক’ না বলে ‘স্ট্যাটাস বজায় রাখা’ কিংবা ‘সম্মানজনক উপঢৌকন’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। বরের সামাজিক অবস্থান ও পেশার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কন্যাপক্ষকে উপহার দিতে চাপ দেওয়া হয়। সামাজিক মর্যাদার দোহাই দিয়ে সামর্থ্যের বাইরে গিয়ে বাড়ি, গাড়ি ও বহুমূল্য সামগ্রী দিতে গিয়ে অনেক পরিবার ঋণগ্রস্ত ও নিঃস্ব হয়ে পড়ে। আর এসব দাবি পূরণে ব্যর্থ হলে নববধূকে অপমান, মানসিক চাপ ও শারীরিক নির্যাতনের মুখে পড়তে হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

পটিয়ায় পরপর দুই অন্তঃসত্ত্বা গৃহবধূর মর্মান্তিক মৃত্যু

পটিয়ায় বিয়ের মাত্র পাঁচ মাসের মাথায় তিন মাসের অন্তঃসত্ত্বা সিফাতুন নূর সিফাতের (২২) ওপর নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে। তার পরিবারের দাবি, গত ১২ অক্টোবর মেয়ের শ্বশুরবাড়িতে ৪৫০টি পিঠা, ফল, মাছ ও দুধসহ বিভিন্ন খাবার পাঠান তার মা। আত্মীয়স্বজনদের মধ্যে বিলানোর জন্য এসব খাবার যথেষ্ট নয়- এমন অজুহাতে শাশুড়ি ও ননদরা সিফাতের ওপর চড়াও হন। এ নিয়ে বিরোধের জেরে ১৪ অক্টোবর তার মাথায় লাঠি দিয়ে আঘাত করা হয় বলে অভিযোগ পরিবারের।

গুরুতর আহত সিফাতকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৬ অক্টোবর তার মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় নিহতের বাবা পটিয়া থানায় মামলা করেন। পুলিশ তার শাশুড়ি রিজিয়া বেগমকে গ্রেপ্তার করেছে। মামলায় শ্বশুরবাড়ির অন্য সদস্যদের বিরুদ্ধেও নির্যাতনের অভিযোগ আনা হয়েছে।

সিফাতের মৃত্যুর শোক কাটতে না কাটতেই পটিয়ার হাবিলাসদ্বীপ ইউনিয়নের চরকানাই গ্রামে মারা যান নয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা তানিয়া কামাল নিহাত (২০)। পরিবারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, স্বামী নুর উদ্দিনের সঙ্গে চার-পাঁচ বছরের প্রেমের সম্পর্কের পর তাদের বিয়ে হয়। কিন্তু বিয়ের পর থেকে ফার্নিচার ও যৌতুকের দাবিতে তানিয়াকে নির্যাতন করা হচ্ছিল বলে অভিযোগ তার স্বজনদের।

পরিবারের দাবি, নির্যাতনের অভিযোগ নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে একাধিকবার সালিশ-বৈঠক হলেও পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। গত ২৬ অক্টোবর দিবাগত রাতে রহস্যজনক অবস্থায় তানিয়ার মৃত্যু হয়। তার বাবার অভিযোগের ভিত্তিতে স্বামী নুর উদ্দিনকে আটক করে পুলিশ।

দুটি ঘটনাতেই স্বামী ছাড়াও শাশুড়ি ও ননদের বিরুদ্ধে নির্যাতনে সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠেছে। 

অতীত ও বর্তমানের চিত্র: বিচারহীনতার দীর্ঘ ছায়া

চট্টগ্রামে যৌতুকের অভিযোগে নারী নির্যাতন ও মৃত্যুর ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়। এর আগে ২০২৪ সালের ২৭ ডিসেম্বর চন্দনাইশে বিদেশ যাওয়ার জন্য দেড় লাখ টাকা যৌতুক না পেয়ে স্ত্রী নাজমা আক্তারকে (২০) নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে স্বামী আবদুল জব্বারের বিরুদ্ধে। পরিবারের অভিযোগ, নির্যাতনে নাজমার হাত ভেঙে দেওয়া হয় এবং একপর্যায়ে তার শরীরে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় পুলিশ স্বামীকে গ্রেপ্তার করে।

একই বছরের ১৭ জুন লোহাগাড়ায় ঈদুল আজহার দিন কোরবানির জন্য ছাগল দাবি পূরণ না হওয়ায় নববধূ মিজবাহুল জান্নাত তারিনকে বিষপান করিয়ে হত্যার অভিযোগ তোলে তার পরিবার।

এ ছাড়া ২০২৬ সালের ৯ অক্টোবর সীতাকুণ্ডের বারৈয়াঢালা ইউনিয়নে যৌতুকের চার লাখ টাকা না পেয়ে গৃহবধূ চন্দনা রানি শীলকে হাত-পা বেঁধে হত্যার অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় স্বামী শিমুল শীলসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এসব ঘটনায় অভিযোগের ধরন ও প্রেক্ষাপট আলাদা হলেও বিয়ের পর অর্থ-সম্পদের দাবি এবং তা ঘিরে নির্যাতনের বিষয়টি সামনে এসেছে।

পরিসংখ্যানে উদ্বেগজনক চিত্র

মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইআরএসএস) ২০২০ থেকে ২০২৪ সালের হিসাব অনুযায়ী, এ সময়ে যৌতুকের কারণে ৩৫৫ নারী শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তাদের মধ্যে ২৬ জন আত্মহত্যা করেন এবং যৌতুক-সম্পর্কিত সহিংসতায় প্রাণ হারান ২৯০ নারী। সংস্থাটির এ পরিসংখ্যান বলছে, যৌতুকের দাবি শুধু পারিবারিক বিরোধে সীমাবদ্ধ থাকছে না, অনেক ক্ষেত্রে তা নারীর মৃত্যুর কারণ হয়ে উঠছে।

চলতি ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অধিকার সংস্থার মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে যৌতুকের কারণে ২২ নারী নিহত হওয়ার তথ্য উঠে এসেছে। একই সময়ে শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ৩৭ নারী এবং আত্মহত্যা করেছেন সাতজন। অর্থাৎ নয় মাসে যৌতুককে কেন্দ্র করে হত্যা, আত্মহত্যা ও শারীরিক নির্যাতনের মোট ৬৬টি ঘটনা সংস্থাটির পর্যবেক্ষণে প্রতিবেদনে তুলে ধরেন।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের (ইউএনএফপিএ) ২০২৪ সালের নারী নির্যাতন জরিপে দেখা গেছে, দেশের ৭৫ দশমিক ৯ শতাংশ বিবাহিত নারী জীবনে অন্তত একবার অন্তরঙ্গ সঙ্গীর সহিংসতার শিকার হয়েছেন। গ্রামাঞ্চলে এ হার ৭৬ শতাংশ এবং শহরাঞ্চলে ৭৫ দশমিক ৬ শতাংশ। চট্টগ্রাম বিভাগে এ হার ৭৮ দশমিক ৫ শতাংশ। 

অন্যদিকে, পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সারা দেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের অভিযোগে ২১ হাজার ৯৩৯টি মামলা হয়েছে। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের আওতায় ধর্ষণ, যৌন নিপীড়ন, যৌতুকসহ বিভিন্ন অপরাধের মামলা রয়েছে।

স্বামীর পাশাপাশি শাশুড়ি-ননদের ভূমিকা ও আইনি বিধান

যৌতুকের কারণে নির্যাতনের ঘটনায় সাধারণত স্বামীর নাম সামনে এলেও শ্বশুরবাড়ির অন্য সদস্যদের বিরুদ্ধেও সম্পৃক্ততার অভিযোগ পাওয়া যায়। পটিয়ার সিফাত ও তানিয়ার ঘটনায় স্বামী ছাড়াও শাশুড়ি ও ননদের বিরুদ্ধে নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। পরিবারের সদস্যদের কেউ যৌতুক দাবি, নির্যাতনে সহায়তা কিংবা অপরাধ সংঘটনে ভূমিকা রাখলে তাঁদের বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

যৌতুক নিরোধ আইন, ২০১৮-এর ৩ ও ৪ ধারা অনুযায়ী যৌতুক দাবি, প্রদান, গ্রহণ কিংবা এ কাজে সহায়তা করা ফৌজদারি অপরাধ। আইনে এ অপরাধের জন্য এক থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড, সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে।

অন্যদিকে, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ১১ ধারায় যৌতুকের জন্য নির্যাতন এবং এর ফলে মৃত্যু বা গুরুতর জখমের ক্ষেত্রে শাস্তির বিধান রয়েছে। যৌতুকের কারণে স্ত্রীর মৃত্যু ঘটানোর অপরাধে মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। এ ধারার আওতায় অপরাধে স্বামী ছাড়াও স্বামীর বাবা-মা, অভিভাবক বা অন্য আত্মীয়ের সম্পৃক্ততা প্রমাণিত হলে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া যায়।

আইনে কঠোর শাস্তির বিধান থাকার পরও যৌতুকের কারণে নির্যাতন ও মৃত্যুর ঘটনা কেন থামছে না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মীরা। তাদের মতে, মামলা দায়েরের পর আপসের চাপ, সাক্ষীর অভাব, তদন্তের দুর্বলতা এবং বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা অপরাধীদের মধ্যে শাস্তি এড়ানোর সুযোগ তৈরি করে।

আইনি বিশেষজ্ঞের চোখে যৌতুক মামলার বাস্তবতা

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী রাসেদুল আনোয়ার রাসেল কালবেলাকে বলেন, যৌতুক নিরোধ আইনের মামলা সম্পর্কে অনেকেরই পর্যাপ্ত ধারণা নেই। অনেকে জানেন না, কোন ধরনের দাবি যৌতুক হিসেবে বিবেচিত হবে এবং এ ক্ষেত্রে আইনি প্রতিকার কীভাবে পাওয়া যায়। যৌতুকের অভিযোগে স্বামী বা স্ত্রী-উভয় পক্ষই পরিস্থিতি অনুযায়ী আইনের আশ্রয় নিতে পারেন।

তিনি বলেন, অনেক সময় আপসের শর্তে আসামিরা জামিন পান। পরে ভুক্তভোগীরা পারিবারিক চাপ বা সামাজিক কারণে মামলা প্রত্যাহার করেন। আবার সাক্ষীর অভাবে অনেক মামলা দুর্বল হয়ে পড়ে। আইন কঠোর হলেও আপস-মীমাংসার প্রবণতা এবং অপরাধের পরও শাস্তি না হওয়ার ধারণা অপরাধীদের পুনরায় একই ধরনের কাজে উৎসাহিত করতে পারে।

যৌতুকের সংজ্ঞা ব্যাখ্যা করে রাসেল বলেন, বৈবাহিক সম্পর্ক বজায় রাখার শর্তে স্থাবর বা অস্থাবর সম্পদ দাবি করা হলে তা যৌতুক হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তবে ব্যবসার প্রয়োজনে স্বাভাবিকভাবে ধার চাওয়া আর বিয়ে টিকিয়ে রাখার শর্তে স্ত্রীর পরিবারের কাছ থেকে অর্থ দাবি করা এক বিষয় নয়। কেউ যদি বলেন, ‘বিয়ে টিকিয়ে রাখতে হলে বাপের বাড়ি থেকে টাকা এনে দিতে হবে’, তাহলে তা যৌতুকের অভিযোগের আওতায় আসতে পারে।

আইনের অপব্যবহার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর ১৭ ধারায় মিথ্যা মামলা বা অভিযোগ দায়েরের ক্ষেত্রে শাস্তির বিধান রয়েছে। এ ধারায় জেনেশুনে মিথ্যা অভিযোগ দায়েরের অপরাধে সাত বছর পর্যন্ত সশ্রম কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড হতে পারে। তবে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া আর জেনেশুনে মিথ্যা অভিযোগ দায়ের করা এক বিষয় নয়; এ ক্ষেত্রেও আইনি প্রক্রিয়ায় বিষয়টি নির্ধারিত হতে হবে।

মানবাধিকারকর্মীর চোখে বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও প্রমাণের সংকট

আইন কঠোর হওয়া সত্ত্বেও যৌতুকের কারণে নির্যাতন না কমার পেছনে বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতাকে অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন মানবাধিকারকর্মী ও আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সাবেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নীনা গোস্বামী।

তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে আমরা দেখতে পাচ্ছি, নারী নির্যাতনের হার ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। পারিবারিক সহিংসতা, যৌতুক, স্বামীর মাদকাসক্তি এবং নারীর ক্ষমতায়নে অনীহার কারণে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বিচার বিভাগের রায় পেতে এত দীর্ঘ সময় লাগে যে, অপরাধীরা ধরেই নেয় জামিন পেয়ে যাবে। ফলে এই ভয়াবহ অন্যায় মানুষের কাছে সহনীয় হয়ে গেছে।

তিনি আরও বলেন, আমাদের দেশে যৌতুক নিরোধ আইন প্রয়োগ হয় না বললেই চলে। শিক্ষিত মহলও লোভের বশে গোপনে যৌতুক আদান-প্রদান করছে। মেয়ের বাবা জামাইয়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে চান না, পাছে মেয়েকে ঘরে না রাখে। আবার শ্বশুরবাড়ির লোকজনের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেওয়ার মতো সাক্ষীও পাওয়া যায় না, কারণ সব সাক্ষীই শ্বশুরবাড়ির। ফলে প্রমাণ ও সাক্ষীর অভাবে মামলাগুলো প্রমাণ করা যায় না এবং শাস্তিও হয় না।

নীনা গোস্বামীর মতে, নির্যাতনের শিকার নারীকে অনেক সময় সামাজিক ও পারিবারিক চাপে আবারও স্বামীর ঘরে ফিরে যেতে হয়। নিরাপদ আশ্রয়, আইনি সহায়তা এবং অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ না থাকলে নির্যাতনের চক্র থেকে বেরিয়ে আসা কঠিন হয়ে পড়ে। তাই শুধু আইন প্রণয়ন নয়, আইনের কার্যকর প্রয়োগ এবং ভুক্তভোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও জরুরি।

আদালতের কঠোর রায় ও আইনি অবস্থান

যৌতুকের কারণে স্ত্রী হত্যার মামলায় চট্টগ্রামের আদালতেও কঠোর শাস্তির নজির রয়েছে। ২০২৬ সালের অক্টোবরে চট্টগ্রামের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-২ যৌতুকের দাবিতে স্ত্রীকে শ্বাসরোধে হত্যার মামলায় স্বামী মো. নাছের উদ্দিনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। ঘটনার প্রায় চার বছর পর এ রায় দেওয়া হয়।

এর আগে ২০২৫ সালের জুলাইয়ে ২০১৭ সালে মিনু নামের এক গৃহবধূকে যৌতুকের বিরোধে শ্বাসরোধে হত্যার মামলায় চট্টগ্রাম বিভাগীয় দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল স্বামী এসকান্দরকে মৃত্যুদণ্ড দেন। দীর্ঘ শুনানি শেষে ১৫ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণের পর এ রায় দেওয়া হয়।

এ ছাড়া চট্টগ্রামের পশ্চিম সদরঘাট এলাকায় যৌতুকের টাকার জন্য স্ত্রীকে শ্বাসরোধে হত্যার মামলায় আদালত আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন। 

ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি ও নৈতিক অবস্থান

ইসলামে বিয়েতে দেনমোহরকে নারীর অধিকার হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। অন্যদিকে, কন্যাপক্ষের কাছ থেকে জোরপূর্বক অর্থ, সম্পদ কিংবা উপহার দাবি করাকে অন্যায় ও জুলুম হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

হাটহাজারী মাদ্রাসার ইসলামি শিক্ষাবিদ আল্লামা শরীফ মাহমুদ বলেন, ইসলামে দেনমোহর দিয়ে নারীকে সম্মানিত করা হয়েছে। কিন্তু জোরপূর্বক উপহার বা জিনিসপত্র দাবি করা সরাসরি শরিয়াহবিরোধী ও গর্হিত অপরাধ। ইসলামে মেয়ের পরিবার থেকে বরপক্ষের যৌতুক চাওয়া বা নেওয়া সম্পূর্ণ হারাম এবং কবিরা গুনাহ। এটি সামাজিক অপরাধ ও অন্যায় জবরদস্তি।

সূত্র: নতুন আরএসএস সোর্স