‘খোকা ঘুমালো, পাড়া জুড়ালো, বর্গি এলো দেশে’— এই বর্গি কারা
গণমাধ্যম ডেক্স
প্রতিদিনের মতো সন্তানকে ঘুম পাড়াচ্ছিলাম। ঘুমের দেশে নিয়ে যাওয়ার জন্য মুখে তুলে নিলাম বাংলার চিরচেনা সেই ঘুমপাড়ানি ছড়া—
‘খোকা ঘুমালো, পাড়া জুড়ালো, বর্গি এলো দেশে,
বুলবুলিতে ধান খেয়েছে, খাজনা দেব কিসে?’
ছড়াটি আমরা শৈশবে শুনেছি। আজ নিজের সন্তানকেও শোনাই। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বয়ে চলা এই ছড়ার সুরে শিশুকে ঘুম পাড়ানোর চেষ্টা করি আমরা। কিন্তু একদিন হঠাৎ মনে প্রশ্ন জাগল, যে ছড়ার শুরুতেই ‘বর্গি এলো দেশে’ বলা হচ্ছে, সেই বর্গি কারা? কেন তাদের আগমন নিয়ে এমন একটি ছড়া তৈরি হয়েছিল? এই ঘুমপাড়ানি ছড়ার ভেতরে কি লুকিয়ে আছে কোনো জনপদের দীর্ঘশ্বাস?
উত্তর খুঁজতে গিয়েই পরিচয় হলো বাংলার ইতিহাসের এক বিস্মৃত, ক্ষতবাহী এক অধ্যায়ের সঙ্গে।
অষ্টাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়। বাংলার শাসনকর্তা নবাব আলিবর্দি খাঁ। কৃষি, বস্ত্রশিল্প, রেশম ও বাণিজ্যে সমৃদ্ধ বাংলা তখন বাইরের শক্তিগুলোর কাছে ছিল আকর্ষণীয় ভূখণ্ড।
এই সময় নাগপুরের মারাঠা শাসক রঘুজি ভোসলের নেতৃত্বে মারাঠা বাহিনী বাংলায় ধারাবাহিক অভিযান চালায়। সেনাপতি ভাস্কর পণ্ডিত ছিলেন এসব অভিযানের অন্যতম প্রধান সংগঠক। মারাঠা অশ্বারোহী বাহিনীর এক শ্রেণির সৈন্যকে বলা হতো ‘বারগির’। বাংলায় শব্দটি পরিচিতি পায় ‘বর্গি’ নামে।
১৭৪২ থেকে ১৭৫১ সাল পর্যন্ত প্রায় এক দশক ধরে বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে তাদের আক্রমণ চলে। বর্ধমান, বীরভূম, মুর্শিদাবাদ, হুগলি, মেদিনীপুরসহ বিস্তীর্ণ জনপদে ছড়িয়ে পড়ে আতঙ্ক।
রাজা-নবাবদের ক্ষমতার লড়াইয়ে সাধারণ মানুষই যে সবচেয়ে বেশি বিপর্যস্ত হয়, বর্গি আক্রমণ তার নির্মম উদাহরণ।
দ্রুতগতির অশ্বারোহী বাহিনী হঠাৎ গ্রামে প্রবেশ করে লুটপাট চালাত। ঘরবাড়ি ও ফসলের ক্ষতি হতো, মানুষ হারাত তাদের শেষ সম্বল। কৃষকের গোলা, তাঁতির কর্মশালা কিংবা ব্যবসায়ীর দোকান। কোনোটিই নিরাপদ ছিল না। প্রাণ ও সম্পদ রক্ষায় বহু মানুষ ভিটেমাটি ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন।
একবার ভাবুন, যে কৃষক সারা বছর পরিশ্রম করে ফসল ফলিয়েছেন, তাঁর ঘরে সেই ফসল কত দিন নিরাপদ থাকবে, তা তিনি জানতেন না। যে মা সন্তানকে ঘুম পাড়াচ্ছেন, তাঁর নিজের মনেই হয়তো ঘুরপাক খাচ্ছে পরবর্তী দিনের অনিশ্চয়তা। একটি জনপদের মানুষের কাছে তখন রাত মানেই নিশ্চিন্ত বিশ্রাম নয়, বরং নতুন কোনো বিপদের আশঙ্কা।
বর্গি আক্রমণের আতঙ্ক কলকাতাকেও উদ্বিগ্ন করে তুলেছিল। সম্ভাব্য আক্রমণ ঠেকাতে ১৭৪২ সালে ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কলকাতার চারপাশে একটি পরিখা খননের উদ্যোগ নেয়। ইতিহাসে এটি ‘মারাঠা ডিচ’ নামে পরিচিত।
ইতিহাসের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো বর্গি আক্রমণের স্মৃতি কেবল ইতিহাসের বইয়ে আটকে থাকেনি। তা জায়গা করে নিয়েছে বাংলার লোকসাহিত্যে, বিশেষ করে শিশুকে ঘুম পাড়ানোর ছড়ায়।
‘খোকা ঘুমালো, পাড়া জুড়ালো’—এই বাক্যে একদিকে যেমন ঘুমন্ত শিশুর শান্ত পৃথিবী, অন্যদিকে ‘বর্গি এলো দেশে’ কথাটিতে তৎকালীন মানুষের নিরাপত্তাহীনতার প্রতিচ্ছবি।
ছড়ার পরের লাইন ‘বুলবুলিতে ধান খেয়েছে, খাজনা দেব কিসে?’— এখানেও ধরা পড়ে কৃষিনির্ভর মানুষের অর্থনৈতিক সংকটের ইঙ্গিত। ফসলহানি, লুটপাট ও খাজনার চাপ; সব মিলিয়ে সাধারণ মানুষের জীবন কতটা দুর্বিষহ হয়ে উঠেছিল, তা এই লোকছড়ার ভাষায় অনুভব করা যায়।
তবে ছড়াটির প্রতিটি অংশে যে সরাসরি ঐতিহাসিক ঘটনার বিবরণ, এমন দাবি করা যায় না। লোকমুখে ছড়া পরিবর্তিত ও পরিবর্ধিত হয়। কিন্তু এর মধ্যে বর্গি আতঙ্কের যে স্মৃতি বহমান, তা বাংলার লোকজ ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন।
দীর্ঘদিন সামরিক প্রতিরোধ চালানোর পর নবাব আলিবর্দি খাঁ ১৭৫১ সালে মারাঠাদের সঙ্গে সন্ধি করেন। এই সমঝোতায় উড়িষ্যার ওপর মারাঠাদের অধিকার স্বীকার এবং বার্ষিক চৌথ প্রদানের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত ছিল। এর মধ্য দিয়ে বাংলায় বর্গি আক্রমণের দীর্ঘ অধ্যায়ের অবসান ঘটে।
কিন্তু একটি সন্ধি কি মানুষের হারানো ভিটেমাটি ফিরিয়ে দিতে পারে? ফিরিয়ে দিতে পারে পুড়ে যাওয়া ঘর, নিঃস্ব কৃষকের গোলা কিংবা হারিয়ে যাওয়া স্বজনের স্মৃতি? ইতিহাসে যুদ্ধের সমাপ্তি থাকে, কিন্তু সাধারণ মানুষের জীবনে তার রেশ থেকে যায় দীর্ঘ সময়।
লেখাটির শুরুতে বলেছিলাম সন্তানকে ঘুম পাড়ানোর মুহূর্তের কথা। শেষে এসেও আবার মনে হলো। আজও আমি সন্তানকে ঘুম পাড়ানোর সময় ছড়াটি বলি। তবে এখন প্রতিটি শব্দ উচ্চারণের সময় আমার কল্পনায় ভেসে ওঠে কয়েক শতাব্দী আগের বাংলার কোনো এক গ্রাম। হয়তো সেখানে একজন মা তাঁর সন্তানকে বুকে আগলে রেখেছেন। বাইরে অজানা আতঙ্ক, সামনে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। তাঁর কণ্ঠেও হয়তো বেজে উঠেছিল এমন কোনো ছড়া, যার ভেতরে মিশে ছিল বেঁচে থাকার আকুতি।
আমরা সন্তানকে ঘুম পাড়াতে ছড়াটি বলি, অথচ ছড়াটির ভেতরের ইতিহাস ঘুমিয়ে নেই। সেখানে জেগে আছে কৃষকের হারানো ফসল, উদ্বাস্তু মানুষের দীর্ঘশ্বাস, মায়ের উৎকণ্ঠা আর একটি জনপদের আতঙ্ক।
ভাবতে অবাক লাগে, কয়েক শতাব্দী পেরিয়ে গেলেও একটি ছড়া কীভাবে ইতিহাসের স্মৃতি বহন করে চলেছে! হয়তো এ কারণেই লোকসাহিত্য কখনো কেবল বিনোদন নয়; তা হয়ে ওঠে ইতিহাসের এমন এক সংরক্ষণাগার, যেখানে রাজা-নবাবদের চেয়ে সাধারণ মানুষের জীবনই বেশি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
ময়মনসিংহ
সূত্র: প্রথম আলো