|
| |
শনিবার, ০৭ নভেম্বর, ২০২৬, ২২ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

স্বত্ব © ২০২৬ গণমাধ্যম। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।

সর্বশেষঃ

৭ নভেম্বর জাতির ভাগ্যাকাশে উদিত হয় যে ধ্রুবতারা

গণমাধ্যম ডেক্স

গণমাধ্যম ডেক্স

প্রকাশ : ০৭ নভেম্বর, ২০২৬, ০৪:২৪ পিএম
২৬৩ পঠিত
৭ নভেম্বর জাতির ভাগ্যাকাশে উদিত হয় যে ধ্রুবতারা
যুক্ত থাকুন
সর্বশেষ খবরের জন্য ফলো করুন:
ইতিহাসের দিগন্তে কিছু নক্ষত্রের আবির্ভাব ঘটে, যাদের প্রদীপ্ত আলো কেবল তাদের সমকালকেই উদ্ভাসিত করে না, বরং কালের সীমানা পেরিয়ে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়ে। তাদের পরিচয় কোনো ক্ষণস্থায়ী রাষ্ট্রীয় পদ-পদবি, রাজনৈতিক ক্ষমতা কিংবা সাময়িক জনপ্রিয়তার সংকীর্ণ গণ্ডিতে আবদ্ধ থাকে না; বরং তাদের অনুপম ব্যক্ত...

ইতিহাসের দিগন্তে কিছু নক্ষত্রের আবির্ভাব ঘটে, যাদের প্রদীপ্ত আলো কেবল তাদের সমকালকেই উদ্ভাসিত করে না, বরং কালের সীমানা পেরিয়ে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়ে। তাদের পরিচয় কোনো ক্ষণস্থায়ী রাষ্ট্রীয় পদ-পদবি, রাজনৈতিক ক্ষমতা কিংবা সাময়িক জনপ্রিয়তার সংকীর্ণ গণ্ডিতে আবদ্ধ থাকে না; বরং তাদের অনুপম ব্যক্তিত্ব, অটল সততা, দেশপ্রেম, কর্মনিষ্ঠা, দূরদর্শিতা এবং জাতির কল্যাণে নিবেদিত আজীবন সাধনার মাধ্যমেই তারা ইতিহাসে এক স্বতন্ত্র ও চিরস্মরণীয় আসন অধিকার করেন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় ইতিহাসে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এমনই এক গভীর তাৎপর্যবহ ও উজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব। তার বর্ণাঢ্য জীবন, সুদূরপ্রসারী রাষ্ট্রচিন্তা, অনন্য উন্নয়নদর্শন এবং সাধারণ জীবনযাপনের অনুপম দৃষ্টান্ত আমাদের জাতীয় ইতিহাসের পাতায় এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়।

৭ নভেম্বর বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অসামান্য তাৎপর্যমণ্ডিত দিন। ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ হিসেবে অভিহিত এই দিনটি ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক এক গভীর সংকটের ঘোর অমানিশা ও অনিশ্চয়তার ভেতর সিপাহী-জনতার অভূতপূর্ব জাগরণের মাধ্যমে এক নতুন দিগন্তের সূচনা করেছিল। সেই সংক্ষুব্ধ সময়ে জিয়াউর রহমান জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে আবির্ভূত হন। পরবর্তীকালে তার বলিষ্ঠ নেতৃত্ব, রাষ্ট্র পরিচালনার সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি এবং জনমুখী উন্নয়নচিন্তা দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ভিত্তিকে এক দীর্ঘস্থায়ী ও সুদৃঢ় গতিপ্রবাহ দান করেছিল।

তাই ৭ নভেম্বরের তাৎপর্য কেবল অতীতের কোনো একটি ঐতিহাসিক ঘটনাকে স্মরণের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়। এই দিনটি আমাদের চেতনায় নতুন করে ধারণ করায় দেশপ্রেম, জাতীয় ঐক্য, আত্মমর্যাদা, সততা, আত্মনির্ভরতা এবং জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্রভাবনার সুমহান আদর্শ। বিশেষ করে, যখন আজকের রাজনীতি ব্যক্তিস্বার্থ, ক্ষমতার লিপ্সা, অর্থবিত্তের অন্ধ প্রতিযোগিতা, তোষামোদ ও সুবিধাবাদী সংস্কৃতির দুষ্টচক্রে জিম্মি হয়ে পড়ার গভীর আশঙ্কায় সমালোচিত, ঠিক তখন জিয়াউর রহমানের জীবন ও কর্মের সুউচ্চ আদর্শগুলো নতুন করে মূল্যায়নের এক অপরিহার্য দাবি রাখে।

১৯৩৬ সালের ১৯ জানুয়ারি বগুড়া জেলার গাবতলী উপজেলার বাগবাড়ি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন জিয়াউর রহমান। তার প্রথিতযশা পিতা মনসুর রহমান সরকারি চাকরিতে রসায়নবিদ হিসেবে কর্মরত ছিলেন। পিতার কর্মময় জীবনের সূত্রে শৈশবের একটি উল্লেখযোগ্য সময় কাটে কলকাতায়; সেখানে তিনি পড়াশোনা করেন ঐতিহ্যবাহী হেয়ার স্কুলে। দেশভাগের পর পরিবারের সঙ্গে পাড়ি জমান তৎকালীন পাকিস্তানের করাচিতে। সেখানে ‘একাডেমি স্কুল’ থেকে মাধ্যমিক পাঠ শেষ করে উচ্চশিক্ষা নেন ডিজে কলেজে। পরবর্তীতে ১৯৫৩ সালে পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমিতে যোগদান করেন এবং ১৯৫৫ সালে কমিশনপ্রাপ্ত হয়ে শুরু করেন তার বর্ণাঢ্য সামরিক জীবন।

অদম্য শৃঙ্খলা, প্রখর দায়িত্ববোধ, অবিচল আত্মবিশ্বাস, বাস্তববাদী মনন এবং অক্লান্ত কর্মনিষ্ঠা ছিল তার ব্যক্তিত্বের সবচেয়ে দীপ্তিময় বৈশিষ্ট্য। সামরিক জীবনের বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ ও গুরুদায়িত্ব সফলভাবে পালনের মধ্য দিয়ে তিনি অর্জন করেছিলেন অনন্য নেতৃত্বগুণ, সাংগঠনিক দক্ষতা, সুদূরপ্রসারী কৌশলগত পরিকল্পনা এবং সংকট উত্তরণের অসাধারণ পারদর্শিতা। ১৯৬৫ সালের ঐতিহাসিক ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে খেমকারান এলাকায় একজন দক্ষ কোম্পানি কমান্ডার হিসেবে তার বীরত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন তার সামরিক জীবনের এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়।

তবে তার জীবনের সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল ও দেদীপ্যমান অধ্যায় মহান মুক্তিযুদ্ধ। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর পৈশাচিক গণহত্যা ও বর্বরোচিত দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে বাঙালির স্বাধীনতার সশস্ত্র সংগ্রামে তিনি সম্মুখসারিতে থেকে নেতৃত্ব দেন। ২৬ মার্চ চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে ঐতিহাসিক স্বাধীনতার ঘোষণার মাধ্যমে তিনি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন। পরবর্তীতে তিনি ১ নম্বর ও ১১ নম্বর সেক্টরের অত্যন্ত সফল দায়িত্ব পালন করেন এবং ‘জেড ফোর্সেস’-এর অধিনায়ক হিসেবে মুক্তিযুদ্ধে গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা রাখেন। তার এই অসামান্য সাহসিকতা, বীরত্ব ও অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তাকে ‘বীর উত্তম’ খেতাবে ভূষিত করা হয়। স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাসে একজন নির্ভীক সেক্টর কমান্ডার ও সম্মুখসারির যোদ্ধা হিসেবে তার ঐতিহাসিক অবদান অত্যন্ত প্রোজ্জ্বল।

জিয়াউর রহমানের ব্যক্তিত্বের সবচেয়ে মহিমান্বিত দিকগুলোর একটি ছিল তার চিরন্তন সরল জীবনযাপন, সুদৃঢ় ব্যক্তিগত সংযম এবং নিখাদ দায়িত্ববোধ। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ও পরম ক্ষমতার আসনে অধিষ্ঠিত থেকেও তার ব্যক্তিগত জীবনে কখনো আড়ম্বর, বিলাসিতা কিংবা ক্ষমতার অহংকার স্থান পায়নি। পোশাক-পরিচ্ছদে, দৈনন্দিন জীবনযাপনের ছন্দে কিংবা সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশে যাওয়ার সাবলীলতায় তিনি ছিলেন সবসময় অনন্যসাধারণ। রাষ্ট্রীয় দায়িত্বকে ব্যক্তিগত বা পারিবারিক সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য অর্জনের সোপান হিসেবে নয়, বরং বঞ্চিত জনগণের প্রতি অর্পিত এক পবিত্র আমানত হিসেবে দেখার মানসিকতাই ছিল তার জীবনদর্শনের মূল ভিত্তি।

তার পারিবারিক জীবনের কিছু স্নিগ্ধ স্মৃতিচারণ এই বিরল সরলতারই বাস্তব চিত্র ফুটিয়ে তোলে। প্রথিতযশা সাংবাদিক মরহুম ফজলে লোহানীর নেওয়া একটি সাক্ষাৎকারের সূত্র ধরে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার একটি স্মৃতিচারণ প্রায়ই উচ্চারিত হয়। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে, রাষ্ট্রপতি থাকাকালীন সময়েও জিয়াউর রহমান সংসার খরচের জন্য স্ত্রীকে মাসে মাত্র দুই হাজার টাকা দিতেন। তাদের দুই কৃতি সন্তান তারেক রহমান ও প্রয়াত আরাফাত রহমানের শৈশবের পোশাক-পরিচ্ছদ সম্পর্কেও জানা যায়, তারা অনেক সময় বাবার পুরোনো প্যান্ট-সার্ট কেটে তৈরি পোশাক পরে সময় কাটিয়েছেন।

এই স্মৃতিচারণের মর্মার্থ কেবল অর্থ সঞ্চয় কিংবা মিতব্যয়িতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতার শিখরে থেকেও ব্যক্তিগত জীবনে সংযম, অপচয়বিমুখতা এবং কঠোর পারিবারিক অনুশাসন বজায় রাখার যে সুমহান দৃষ্টান্ত এতে প্রতিফলিত হয়, সেটাই আজকের দিনে বড় বেশি প্রাসঙ্গিক। দেশের প্রতিটি ইঞ্চি মাটি এবং রাষ্ট্রের প্রতিটি বিন্দু সম্পদকে জনগণের পবিত্র আমানত হিসেবে বিবেচনা করার এই মানসিকতাই একজন প্রকৃত রাষ্ট্রনায়কের সুমহান চারিত্রিক দৃঢ়তার পরিচায়ক।
 
তার মহাপ্রয়াণের পর ব্যাংক হিসাবে মাত্র ২ হাজার টাকার সামান্য বেশি জমানো থাকার যে তথ্য পাওয়া যায়, তা তার অনন্যসাধারণ সততারই এক জীবন্ত দলিল। যদিও পরবর্তীতে প্রকাশিত সম্পদ বিবরণীতে তার নামে জনতা ব্যাংকে দুই হাজার ৩৫৯ টাকার হিসাব নিশ্চিত হওয়া গেছে, তবুও এই আলোচনার মূল তাৎপর্য নিহিত রয়েছে একথাই প্রমাণ করার মধ্যে যে, রাষ্ট্রপতির মতো শীর্ষ পদে দায়িত্ব পালনকালে তার নামে কোনো পাহাড়সম অবৈধ ব্যক্তিগত সম্পদের ন্যূনতম লেশমাত্রও ছিল না। একজন রাষ্ট্রনায়কের প্রকৃত সাফল্য কতো কোটি টাকার মালিক হলেন কিংবা কতো বড় ক্ষমতার সাম্রাজ্য গড়ে তুললেন তার ওপর নির্ভর করে না; বরং ক্ষমতা ছাড়ার পর সাধারণ মানুষের হৃদয়ে তিনি কতোটা শ্রদ্ধার আসনে আসীন থাকতে পারলেন, সেটাই তার জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ মাপকাঠি।

চলতি বছর জাতীয় নির্বাচনের প্রাক্কালে মনোনয়ন প্রত্যাশী হিসেবে গণসংযোগের অংশ হিসেবে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণির কৌতূহলী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে খোলামেলা আলাপচারিতার সুযোগ হয়েছিল আমার। একপর্যায়ে তাদের কাছে সরল মনে জানতে চেয়েছিলাম, একজন সেনাপ্রধান ও দেশের রাষ্ট্রপতির ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাবে কতো টাকা থাকতে পারে? কোমলমতি শিক্ষার্থীরা তাদের ধারণার জগৎ থেকে জবাব দিয়েছিল—কারও মতে দশ কোটি, কারও মতে পনেরো কোটি, আবার কেউ বা বলে উঠেছিল ১০০ কোটি ৫০০ কোটি টাকা! তাদের কাছে রাষ্ট্রপতি মানেই যেন অপার ক্ষমতা, বিপুল অর্থবিত্ত এবং রাজকীয় বিলাসবহুল এক জীবনযাপনের প্রতিচ্ছবি।

কিন্তু যখন তাদের সম্মুখে জিয়াউর রহমানের ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাবের ঐতিহাসিক ও সত্যনিষ্ঠ চিত্র তুলে ধরেছিলাম, তখন তাদের নিষ্পাপ চোখে-মুখে ভেসে উঠেছিল গভীর বিস্ময়। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী একজন মানুষ কীভাবে এতোটা সাদামাটা ও নির্মোহ জীবনযাপন করতে পারেন, তা যেন তাদের শৈশবের কল্পনারও সম্পূর্ণ অতীত ছিল। শিক্ষার্থীদের সেই সরল বিস্ময় আমাকে ভেতর থেকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল। কারণ, আজকের নতুন প্রজন্মের সামনে রাজনীতি ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার যে বিকৃত চিত্র ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে, তার বিপরীতে একজন সংযমী রাষ্ট্রনায়কের এমন জীবনযাত্রা এক বিরাট শিক্ষণীয় ব্যবধান তৈরি করে।

আজকের দিনে রাজনৈতিক পরিচয়, ক্ষমতার অপব্যবহার কিংবা প্রভাব খাটিয়ে রাতারাতি বিপুল সম্পদের মালিক বনে যাওয়ার লোমহর্ষক চিত্র প্রায়শই সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম হয়। রাজনৈতিক পদে আসীন ব্যক্তিদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টের স্ফীতি, নামে-বেনামে অঢেল সম্পত্তি, জমি ও বাণিজ্যিক সিন্ডিকেটের খবর সাধারণ মানুষের মনে তীব্র হতাশা ও অনাস্থা জন্ম দেয়। ফরিদপুরের ছাত্রলীগ সভাপতি ও  সেক্রেটারির হাজার কোটি টাকা পাচার, ব্যাংক লেনদেন ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের সংবাদও সেই সামাজিক উদ্বেগেরই একটি জ্বলন্ত উদাহরণ। রাজনীতি মূলত মানুষের কল্যাণ সাধন, মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং সুশাসন নিশ্চিত করার এক পবিত্র দায়িত্বশীল মাধ্যম। অথচ এই রাজনীতির মহিমান্বিত পরিচয়কে কুক্ষিগত করে যদি ব্যক্তিগত বিত্তবৈভব গড়া, পেশিশক্তি প্রদর্শন, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, নিয়োগ বাণিজ্য কিংবা রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধার হরিলুট চালানো হয়, তবে জনসেবার সঙ্গে রাজনীতির চিরায়ত ও মৌলিক সম্পর্কের শেকড়টাই নড়বড়ে হয়ে পড়ে।

এই ক্রান্তিকালে জিয়াউর রহমানের ব্যক্তিগত সংযম, নিরলস কর্মনিষ্ঠা এবং দেশপ্রেমিক জীবন আমাদের সামনে এক অনন্য আলোকবর্তিকা নিয়ে হাজির হয়। তার জীবন আমাদের বারংবার স্মরণ করিয়ে দেয়, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ শিখরে থেকেও সম্পদের পাহাড় না গড়ে নিজেকে জনকল্যাণে নিবেদিত রাখা সম্ভব। রাজনীতির আসল শক্তি কখনো অর্থকড়ি কিংবা ক্ষমতার দাপট নয়; এর মূল শক্তি হলো নিঃশর্ত সততা, সুদৃঢ় আদর্শ এবং সাধারণ মানুষের অপরিসীম ভালোবাসা ও আস্থা।

স্বাধীনতার অব্যবহিত পর বাংলাদেশ ছিল এক রক্তাক্ত যুদ্ধবিধ্বস্ত, অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু, তীব্র খাদ্যসংকটে জর্জরিত এবং ভঙ্গুর অবকাঠামোর একটি রাষ্ট্র। এদেশের কোটি মানুষের জীবনে তখন গ্রাস করেছিল পুঞ্জীভূত দারিদ্র্য, অনিশ্চয়তা ও হাহাকার। এমন এক শোচনীয় পরিস্থিতিতে দেশের অর্থনীতি পুনর্গঠন, কৃষি উৎপাদন বহুগুণ বৃদ্ধি এবং অবহেলিত গ্রামীণ জনপদকে উন্নয়নের মূল স্রোতধারায় সম্পৃক্ত করা ছিল সময়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুদায়িত্ব কাঁধে নিয়ে জিয়াউর রহমান সুদৃঢ়ভাবে উপলব্ধি করেছিলেন যে, বাংলাদেশের মূল প্রাণশক্তি নিহিত রয়েছে এর উর্বর মাটি, অদম্য মানুষ, কৃষক, শ্রমিক এবং অফুরান জনশক্তির মাঝে। এই বিশাল শক্তিকে যদি সঠিকভাবে কাজে লাগানো না যায়, তবে কেবল বিদেশি অনুদান বা ঋণের ওপর নির্ভর করে কোনো দিনই একটি আত্মমর্যাদাশীল ও শক্তিশালী রাষ্ট্র গড়ে তোলা সম্ভব নয়।

এই দূরদর্শী উপলব্ধি থেকেই তিনি কৃষি খাতের উন্নয়ন, সেচ ব্যবস্থার সম্প্রসারণ, গ্রামীণ অবকাঠামো নির্মাণ এবং উৎপাদনমুখী কর্মকাণ্ডকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন। তার উন্নয়ন দর্শনের সবচেয়ে উজ্জ্বল প্রতীক ছিল দেশব্যাপী ঐতিহাসিক ‘খাল খনন ও পুনঃখনন কর্মসূচি’। কৃষিজমিতে সেচ সুবিধা পৌঁছে দেওয়া, অনাবাদি পতিত জমিকে চাষাবাদের আওতায় নিয়ে আসা এবং কৃষকের শস্য উৎপাদন ক্ষমতা বহুগুণ বাড়িয়ে তোলার মহৎ উদ্দেশ্যে এই গণমুখী কর্মসূচি পরিচালিত হয়েছিল। নানাবিধ উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে তার স্বতঃস্ফূর্ত শারীরিক অংশগ্রহণ তৎকালীন সময়ে সাধারণ মানুষের সঙ্গে নেতৃত্বের নিবিড় মেলবন্ধনের এক অনন্য ইতিহাস সৃষ্টি করেছিল।

এই বহুমুখী উদ্যোগের তাৎপর্য কেবল মাটি কাটার মধ্যে সীমিত ছিল না; এর মধ্য দিয়ে মূলত গ্রামীণ অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করা, কর্মসংস্থানের নতুন ক্ষেত্র তৈরি করা এবং মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত সম্মিলিত অংশগ্রহণের ধারণাকে সুপ্রতিষ্ঠিত করা হয়েছিল। কৃষক সমাজকে জাতীয় উন্নয়নের প্রধান কেন্দ্রবিন্দুতে স্থাপন এবং গ্রামবাংলাকে রাষ্ট্রীয় অগ্রগতির অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হিসেবে বিবেচনা করাই ছিল তার অর্থনৈতিক চিন্তার মূল স্পন্দন। শিক্ষার বিস্তার, গণসচেতনতা বৃদ্ধি, পরিবার পরিকল্পনা, দেশব্যাপী ব্যাপক বৃক্ষরোপণ, মৎস্য চাষ ও পশুপালনের প্রসার এবং গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নে তার সরকারের প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল সুদূরপ্রসারী। ‘গ্রাম সরকার’ ও ‘গ্রাম প্রতিরক্ষা দল’-এর মতো উদ্ভাবনী উদ্যোগের মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে জনগণের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ এবং সুসংগঠিত সামাজিক কর্মকাণ্ডকে দারুণভাবে উৎসাহিত করা হয়েছিল। তার উন্নয়ন দর্শনের মূল বাণীই ছিল—উন্নয়ন কেবল রাজধানী কিংবা বড় বড় শহরের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং দেশের প্রতিটি প্রত্যন্ত গ্রামের কৃষক, শ্রমজীবী ও সাধারণ মানুষকেই তার সুফল ভোগ করতে হবে।

অর্থনৈতিক মুক্তির ক্ষেত্রেও জিয়াউর রহমান উৎপাদনমুখী অর্থনীতির চাকা সচল করা এবং বেসরকারি খাতের উন্মুক্ত বিকাশের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছিলেন। স্বাধীনতার পরপরই শিল্পায়ন, অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক বিনিয়োগ, নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টি এবং কর্মসংস্থানের অফুরান ক্ষেত্র তৈরিতে অর্থনৈতিক কাঠামোয় আমূল পরিবর্তন আনা অপরিহার্য হয়ে পড়েছিল। সেই ঐতিহাসিক বাস্তবতায় তার শাসনামলেই বেসরকারি উদ্যোক্তাদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করার যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। দেশীয় শিল্প উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করা, রপ্তানিমুখী উৎপাদনের প্রসার ঘটানো এবং বিদেশি বিনিয়োগের অপার সম্ভাবনা তৈরির পথ প্রশস্ত করা হয়।

বাংলাদেশের আজকের বিশ্বজোড়া অহংকার—তৈরি পোশাকশিল্পের প্রাথমিক ও ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনও এই সময়ের অর্থনৈতিক রূপান্তরের সঙ্গেই গভীরভাবে জড়িত। ১৯৭৭-৭৮ সালের দিকে তৈরি পোশাক রপ্তানির শুভসূচনা এবং ১৯৭৮ সালে ‘দেশ গার্মেন্টস’ ও দক্ষিণ কোরিয়ার বিখ্যাত ‘দাইউ করপোরেশন’-এর যৌথ উদ্যোগ পরবর্তীতে বাংলাদেশের রপ্তানিমুখী পোশাক খাতের অপ্রতিরোধ্য অগ্রযাত্রার পথ উন্মুক্ত করে দিয়েছিল। এ ক্ষেত্রে উদ্যোক্তাদের ব্যক্তিগত উদ্যোগের পাশাপাশি তৎকালীন সরকারের সময়োপযোগী নীতিগত সহায়তা এবং বেসরকারি খাতের প্রসারে অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টির ভূমিকা ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। আজ এই তৈরি পোশাকশিল্প লক্ষ লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থান এবং দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের প্রধান স্তম্ভ হিসেবে দাঁড়িয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের বিশাল শ্রমবাজার সম্প্রসারণ এবং জনশক্তি রপ্তানির ক্ষেত্রেও তার আমলেই সূচিত হয়েছিল অভূতপূর্ব অগ্রগতি। বিদেশে নিরাপদ কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি, রেমিট্যান্স প্রবাহের সূচনা এবং প্রবাসী শ্রমিকদের কষ্টার্জিত বৈদেশিক মুদ্রা দেশের ভবিষ্যৎ অর্থনীতিতে এক নতুন সম্ভাবনার দুয়ার উন্মুক্ত করেছিল। আজ প্রবাসী আয় যে আমাদের জাতীয় অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি, তার ঐতিহাসিক বীজ রোপিত হয়েছিল সেই দূরদর্শী উদ্যোগগুলোর মাধ্যমেই।

আন্তর্জাতিক কূটনীতির অঙ্গনেও একটি নবীন ও যুদ্ধবিধ্বস্ত রাষ্ট্রকে বিশ্বমঞ্চে এক মর্যাদাপূর্ণ ও স্বাধীন সত্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে জিয়াউর রহমান বাস্তববাদী কূটনীতি এবং বহুমুখী দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক প্রসারের ওপর জোর দিয়েছিলেন। চীন, পশ্চিমা বিশ্ব, মুসলিম উম্মাহর দেশসমূহ এবং দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে পারস্পরিক সমতার ভিত্তিতে সুসম্পর্ক গড়ে তোলার তার কূটনৈতিক প্রয়াস বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক যোগাযোগের দিগন্তকে বহুগুণ প্রসারিত করেছিল। দেশের ভৌগোলিক অবস্থান এবং আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সম্ভাবনার কথা মাথায় রেখে প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে একটি বৃহত্তর সহযোগিতামূলক কাঠামো গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তাও তিনি উপলব্ধি করেছিলেন।

এই দূরদর্শী রাজনৈতিক চিন্তার সবচেয়ে সফল ও ঐতিহাসিক রূপায়ন ছিল দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা—‘সার্ক’ (SAARC) প্রতিষ্ঠার মহান উদ্যোগ। ১৯৮০ সালে জিয়াউর রহমান দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়ানোর সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব বিশ্বমঞ্চে উত্থাপন করেছিলেন। তাঁর এই সাহসী ও সময়োপযোগী উদ্যোগই পরবর্তীতে আঞ্চলিক আলোচনার টেকসই ভিত্তি স্থাপন করে। পরিশেষে, ১৯৮৫ সালের ডিসেম্বরে ঢাকায় অনুষ্ঠিত ঐতিহাসিক প্রথম সার্ক শীর্ষ সম্মেলনের মধ্য দিয়ে এই আঞ্চলিক সংস্থাটি আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মপ্রকাশ করে। এটি ছিল দক্ষিণ এশিয়ার কোটি কোটি মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি, দারিদ্র্য বিমোচন, বাণিজ্য সম্প্রসারণ, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও পারস্পরিক মৈত্রীর এক সুদূরপ্রসারী ও স্বপ্নদর্শী প্রয়াস। একটি জনবহুল ও নবীন দেশের রাষ্ট্রনায়ক হয়েও আঞ্চলিক সহযোগিতার এমন বিশাল ও মহৎ প্ল্যাটফর্ম বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরা তার অসাধারণ কূটনৈতিক দূরদর্শিতারই চূড়ান্ত প্রমাণ বহন করে।

জিয়াউর রহমানের চরিত্রের আরেকটি অত্যন্ত আকর্ষণীয় ও অনুকরণীয় দিক ছিল রাজনৈতিক মতপার্থক্যের সকল সংকীর্ণতা ছাড়িয়ে মানবিক মূল্যবোধকে সর্বোচ্চ আসনে স্থান দেওয়ার মানসিকতা। একজন প্রকৃত রাষ্ট্রনায়কের উদারতা ও মহত্ত্ব কেবল নিজের অনুসারীদের প্রতি আচরণে প্রকাশ পায় না; বরং রাজনৈতিক ও আদর্শগতভাবে সম্পূর্ণ ভিন্নমতের মানুষের প্রতিও ন্যায়সংগত ও মানবিক আচরণ প্রদর্শনের মধ্য দিয়েই তার আসল পরিচয় ফুটে ওঠে।

এ প্রসঙ্গে পরমাণুবিজ্ঞানী ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়ার সরকারি চাকরির একটি ঘটনা এখানে উল্লেখ করতে চাই। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের মর্মান্তিক পটপরিবর্তনের পর বঙ্গবন্ধু তনয়া শেখ হাসিনা এবং তার স্বামী বিশিষ্ট পরমাণুবিজ্ঞানী ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়া বিদেশে (জার্মানি ও ভারত) অবস্থান করছিলেন। সেই সংকটময় মুহূর্তে ড. ওয়াজেদ মিয়ার সরকারি চাকরি বাতিল বা বরখাস্ত করার একটি প্রশাসনিক ফাইল তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের টেবিলে অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হয়েছিল। কথিত আছে, তিনি সেই নথিতে নিজের হাতে অত্যন্ত বিচক্ষণতার সঙ্গে লিখে দিয়েছিলেন—“Please wait till he comes back”—অর্থাৎ, তিনি দেশে ফিরে না আসা পর্যন্ত অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন।

এই ঐতিহাসিক ঘটনার মূল তাৎপর্য লুকিয়ে রয়েছে এক গভীর ও উদার মানবিক দর্শনে। রাজনৈতিক রেষারেষি কিংবা পারিবারিক পরিচয়ের সূত্র ধরে কোনো নিরীহ মানুষের পেশাগত ও নাগরিক অধিকার কেড়ে নেওয়ার হীন মানসিকতার পরিবর্তে ন্যায়বিচার ও নিয়মতান্ত্রিক সিদ্ধান্তের জন্য অপেক্ষা করার এই নজিরবিহীন মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে এক অনন্য নৈতিক শিক্ষা প্রদান করে। ব্যক্তি ও মতাদর্শের যত তীব্র বিরোধই থাকুক না কেন, রাষ্ট্রীয় ন্যায়বিচার এবং মানুষের মৌলিক মানবিক অধিকার যেন কখনো বিসর্জিত না হয়—এটাই একটি সুস্থ ও সভ্য রাষ্ট্রব্যবস্থার অন্যতম প্রধান শর্ত।

আজকের বাংলাদেশের জটিল রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই মানবিক মূল্যবোধ ও সহনশীলতার প্রয়োজনীয়তা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি তীব্র। আজ জাতির সামনে বিরাট প্রশ্নচিহ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে—রাজনীতি কি সত্যিই মানুষের ভাগ্যোন্নয়নের জন্য, নাকি এটি ব্যক্তিগত সম্পদ কুক্ষিগত করার, প্রভাব বিস্তার করার এবং সর্বগ্রাসী ক্ষমতা অর্জনের হাতিয়ারে পরিণত হচ্ছে? এককালের আদর্শভিত্তিক রাজনীতির অর্থ ছিল ত্যাগের মহিমা, মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রাম এবং দেশের প্রয়োজনে নিজেকে উৎসর্গ করার মানসিকতা। অথচ বর্তমানের কলুষিত রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে অনেক ক্ষেত্রেই সেই সুমহান মূল্যবোধগুলোর জায়গা দখল করে নিয়েছে অর্থবিত্তের দেমাক, ক্ষমতার অপব্যবহার, তোষামোদ এবং অন্ধ দলীয়করণ।

জিয়াউর রহমানের বর্ণাঢ্য কর্মজীবনের যে অনুপম গুণগুলো আজ আমাদের বিশেষভাবে স্মরণ করা প্রয়োজন, তা হলো—কঠোর কর্মনিষ্ঠা, ইস্পাতকঠিন শৃঙ্খলা, ব্যক্তিগত সংযম এবং অর্পিত দায়িত্বের প্রতি নিখাদ বিশ্বস্ততা। তার বর্ণিল জীবনদর্শনের আয়নায় বর্তমান রাজনৈতিক কাঠামোর গলদ ও দুর্বলতাগুলো কঠোরভাবে মূল্যায়ন করা সময়ের দাবি। কোনো রাজনৈতিক বা দলীয় পরিচয়ই দুর্নীতি, অনিয়ম বা অপরাধের লাইসেন্স হতে পারে না। দলের সাইনবোর্ড, পদ-পদবি কিংবা ক্ষমতার উমেদারদের সঙ্গে বিশেষ সখ্য—কোনো কিছুই অপকর্মকে বৈধতা দিতে পারে না। রাষ্ট্রের প্রতিটি সম্পদ হলো এদেশের সাধারণ মানুষের রক্ত-ঘামে অর্জিত সম্পদ; সেই সম্পদের তছরুপ করা মানে জনগণের মৌলিক অধিকার ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করা।

শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক ও পারিবারিক উত্তরসূরি হিসেবে আজ সেই দায়িত্বের ভার বহন করছেন তারই জ্যেষ্ঠ পুত্র তারেক রহমান। একজন রাজনৈতিক উত্তরাধিকারীর জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কেবল পূর্বসূরির ঐতিহাসিক নাম ও পদবি বহন করা নয়; বরং তার জীবন থেকে ইতিবাচক ও কল্যাণকর শিক্ষা গ্রহণ করে বর্তমান বাস্তবতার আলোাক তার সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিত করা। এদেশের সাধারণ মানুষের প্রত্যাশাও আজকের নেতৃত্বের কাছে অনেক বেশি। জিয়াউর রহমানের ব্যক্তিগত সংযম, আপসহীন সততা, কর্মনিষ্ঠা, দেশপ্রেম এবং জনমুখী রাষ্ট্রচিন্তার দীপ্তিময় আদর্শগুলো যদি জাতীয় রাজনীতি ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে পুরোপুরি প্রতিষ্ঠা করা যায়, তবেই তা হবে তাঁর ঐতিহাসিক উত্তরাধিকারের সবচেয়ে সার্থক ও অর্থবহ মূল্যায়ন।

তবে শুধু নেতার ব্যক্তিগত সাদামাটা জীবনযাপনই যথেষ্ট নয়; একজন প্রকৃত রাষ্ট্রনায়কের নেতৃত্ব তখনই সার্থক হয়, যখন তার গড়া রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো পুরোপুরি স্বচ্ছ, দুর্নীতিমুক্ত, জবাবদিহিমূলক এবং জনবান্ধব হিসেবে গড়ে ওঠে। প্রধানমন্ত্রীর বা শীর্ষ নেতৃত্বের চারপাশে কোনো অবস্থাতেই সুবিধাভোগী কোনো সিন্ডিকেট বা চক্র গড়ে উঠতে দেওয়া যাবে না। অন্ধ রাজনৈতিক আনুগত্যের পুরস্কার হিসেবে কোনো অযোগ্য বা দুর্নীতিবাজকে অনৈতিক সুবিধা দেওয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করতে হবে। দলের নাম ভাঙিয়ে চাঁদাবাজি, দখলদারিত্ব, পদ-বাণিজ্য, নিয়োগ-বাণিজ্য কিংবা রাষ্ট্রীয় সম্পদের লুটপাটের পথ চিরতরে বন্ধ করতে হবে। অপরাধী যে দলেরই হোক, তার রাজনৈতিক বা সামাজিক পরিচয় যাই হোক না কেন, আইনের নিরপেক্ষ ও কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে সবার জন্য সমানভাবে।

আমার পূর্বের বেশ কিছু কলামেও এ বিষয়ে আমি সংশ্লিষ্ট মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছি। কারণ, রাষ্ট্র পরিচালনার সবচেয়ে বড় এবং সুরক্ষিত দুর্গ কোনো চাটুকার বলয় বা ক্ষমতার শক্তি নয়; এর আসল শক্তি হলো সাধারণ মানুষের নিরঙ্কুশ ভালোবাসা ও আস্থার প্রতীক। তোষামোদকারীরা সাময়িকভাবে একজন নেতাকে কৃত্রিম প্রশংসায় সন্তুষ্ট করতে পারলেও, কেবল সত্যনিষ্ঠ, সৎ ও দক্ষ মানুষের সাহসী পরামর্শই একজন নেতাকে সঠিক ও ঐতিহাসিক পথে টিকিয়ে রাখতে পারে। জিয়াউর রহমানের জীবন থেকে শিক্ষা নিয়ে বর্তমান নেতৃত্ব যদি সততা, শৃঙ্খলা, দায়িত্ববোধ ও জনকল্যাণকে রাষ্ট্র পরিচালনার মূল মন্ত্র হিসেবে গ্রহণ করে, তবেই বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে একটি দীর্ঘ প্রতীক্ষিত ইতিবাচক পরিবর্তনের সোনালি দুয়ার উন্মুক্ত হতে পারে।

একটি দেশের সামগ্রিক ভাগ্য বদলানোর জন্য কেবল ফাঁকা রাজনৈতিক স্লোগান, হুজুগে প্রতিশ্রুতি কিংবা সংস্কারের চটকদার ঘোষণা কখনোই যথেষ্ট নয়। এর জন্য প্রয়োজন আপসহীন নৈতিক নেতৃত্ব, দক্ষ ও পেশাদার প্রশাসন, আইনের শাসন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি এবং জনগণের প্রতি দায়বদ্ধ এক রাজনৈতিক সংস্কৃতি। জিয়াউর রহমানের উন্নয়ন দর্শনের অন্যতম প্রধান শিক্ষা ছিল—‘আত্মনির্ভরতা’। নিজ দেশের শক্তিকে চিনতে হবে, নিজস্ব সম্পদকে কাজে লাগাতে হবে, কৃষি ও শিল্পের উৎপাদন বহুগুণ বাড়াতে হবে এবং তরুণ প্রজন্মের জন্য নতুন নতুন কর্মসংস্থানের দিগন্ত খুলে দিতে হবে। তার রাষ্ট্রভাবনায় গ্রামবাংলা, কৃষক, শ্রমিক এবং সাধারণ মেহনতি মানুষের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করাটাই ছিল সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার।

আজকের একবিংশ শতাব্দীর বাংলাদেশেও সেই সুদূরপ্রসারী দর্শনের প্রয়োজনীয়তা ও প্রাসঙ্গিকতা অপরিসীম। এদেশের বিশাল জনগোষ্ঠীকে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তরিত করা, কৃষির আধুনিক প্রযুক্তিগত উন্নয়ন, যুগোপযোগী শিল্পায়ন, রপ্তানি পণ্যের বহুমুখীকরণ, তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা প্রবাসী শ্রমিকদের সাংবিধানিক মর্যাদা ও অধিকার শতভাগ নিশ্চিত করার মাধ্যমেই কেবল একটি আত্মনির্ভরশীল অর্থনীতির মজবুত ভিত্তি গড়ে তোলা সম্ভব। একই সঙ্গে দেশ থেকে দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, দখলদারিত্ব, মাদকের করাল গ্রাস, অর্থ পাচার এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রকে কঠোর ও আপসহীন অবস্থান নিতে হবে। রাজনৈতিক পরিচয় যেন কখনো অপরাধের বর্ম বা ঢাল হয়ে দাঁড়াতে না পারে এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো যেন যেকোনো ব্যক্তিগত বা দলীয় সংকীর্ণ স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে, তা সুনিশ্চিত করতে হবে।

১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামের এক মর্মান্তিক ও সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্রের রাতে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে নির্মমভাবে শহীদ হন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। তার এই হঠাৎ আকস্মিক ও নৃশংস প্রয়াণে বাংলাদেশ হারিয়েছিল একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা, দূরদর্শী রাষ্ট্রনায়ক ও প্রজ্ঞাবান রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে। তার ঐতিহাসিক জানাজায় লাখো-কোটি সাধারণ মানুষের উপচে পড়া উপস্থিতি সেদিন অকাট্যভাবে প্রমাণ করেছিল, তার মৃত্যুতে এদেশের মাটি ও মানুষ কতোটা গভীরভাবে শোকাহত হয়েছিল। একজন মানুষের প্রকৃত ও চিরন্তন মূল্যায়ন কেবল তার জীবদ্দশার ক্ষমতার দাপট কিংবা রাষ্ট্রীয় পদমর্যাদার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং মৃত্যুর বহু বছর পরেও তার কীর্তি, আদর্শ এবং অবদান কতোটা শ্রদ্ধার সঙ্গে আলোচিত হয় এবং নতুন প্রজন্ম তার জীবন থেকে কতোটা দেশপ্রেমের শিক্ষা নেয়, সেটাই ইতিহাসে তার আসল আসনকে অর্থবহ করে তোলে।

জিয়াউর রহমানের বর্ণাঢ্য জীবন আমাদের সামনে তুলে ধরে একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার অদম্য সাহস, একজন চৌকস সামরিক কর্মকর্তার নিখাদ শৃঙ্খলা, একজন দূরদর্শী রাষ্ট্রনায়কের উন্নয়নচিন্তা, একজন নেতার অক্লান্ত কর্মনিষ্ঠা এবং একজন সাধারণ মানুষের পরম সংযমের বহুমাত্রিক রূপ। তার রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ড নিয়ে ইতিহাস তার নিজস্ব মাপকাঠিতে মূল্যায়ন করবে; তবে বাংলাদেশের কৃষি বিপ্লব, গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন, বেসরকারি খাতের বিকাশ, জনশক্তি রপ্তানি এবং আঞ্চলিক বন্ধুত্বের ক্ষেত্রে তার নেওয়া ঐতিহাসিক উদ্যোগগুলো আমাদের জাতীয় ইতিহাসের চিরকালীন ও গৌরবোজ্জ্বল অংশ হয়ে থাকবে।

আজকের এই ভোগবাদী, সুবিধাবাদী ও সীমাহীন দুর্নীতির অভিযোগে জর্জরিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় তার জীবন থেকে আমাদের শিক্ষা নিতে হবে যে—ক্ষমতার চেয়ে দায়িত্ব অনেক বড়, বৈষয়িক সম্পদের চেয়ে সততা অনেক মহৎ, ব্যক্তিগত মোহের চেয়ে দেশের স্বার্থ সবার উপরে; আর তোষামোদের অন্ধ বৃত্ত থেকে বেরিয়ে সত্য ও যোগ্যতার সঠিক মূল্যায়নই হওয়া উচিত একজন আদর্শ নেতার প্রধান ভূষণ।

৭ নভেম্বর তাই কেবল গতানুগতিক স্মৃতিচারণ বা আনুষ্ঠানিকতা পালনের দিন নয়; এটি আত্মসমালোচনা, আত্মশুদ্ধি এবং নতুন করে দেশ গড়ার শপথ নেওয়ার দিন। আজকের এই পবিত্র দিনটি হোক একটি স্বনির্ভর, মানবিক, দুর্নীতিমুক্ত, ন্যায়ভিত্তিক ও আত্মমর্যাদাশীল বাংলাদেশ গড়ার নতুন সুদৃঢ় প্রতিজ্ঞার দিন। ইতিহাসের অনন্ত আকাশে কিছু মানুষ চিরকাল ধ্রুবতারার মতো উজ্জ্বল হয়ে থাকেন, যাদের অনুপম জীবন ও কর্ম ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে চিরকাল সঠিক পথের দিশা দেয়। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে তেমনই এক চিরস্মরণীয় ও দীপ্তিময় নাম। তার অকৃত্রিম দেশপ্রেম, নিরলস কর্মনিষ্ঠা, সরল জীবনযাপন, ব্যক্তিগত সততা, মানবিক উদারতা এবং উন্নয়নমুখী রাষ্ট্রচিন্তার ইতিবাচক শিক্ষাগুলো আমাদের জাতীয় জীবনে পুরোপুরি ধারণ করতে পারলেই ৭ নভেম্বরের ঐতিহাসিক তাৎপর্য সত্যিকার অর্থে সার্থক ও ফলপ্রসূ হয়ে উঠবে।

মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে জান্নাতের সুউচ্চ মাকাম দান করুন। তার বর্ণাঢ্য জীবন থেকে সততা, দেশপ্রেম, আত্মনির্ভরতা ও জনকল্যাণের মহান শিক্ষা গ্রহণ করে আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ সত্য ও সুন্দরের আলোয় উদ্ভাসিত হোক—এটাই হোক আমাদের আজকের দিনের একান্ত প্রার্থনা। মহান আল্লাহ সুবহানাতায়ালা আমাদের সহায় হোন।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সম্পাদক, ‘আমার দিন’।

ই-মেইল: ahabibhme@gmail.com   

সূত্র: নতুন আরএসএস সোর্স