|
| |
বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর, ২০২৬, ২০ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

স্বত্ব © ২০২৬ গণমাধ্যম। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।

সর্বশেষঃ

তিতাস একটি যদির নাম: ঋত্বিক ঘটকের ১০১তম জন্মবর্ষে

গণমাধ্যম ডেক্স

গণমাধ্যম ডেক্স

প্রকাশ : ০৫ নভেম্বর, ২০২৬, ১০:৩১ এএম
২৬২ পঠিত
তিতাস একটি যদির নাম: ঋত্বিক ঘটকের ১০১তম জন্মবর্ষে
যুক্ত থাকুন
সর্বশেষ খবরের জন্য ফলো করুন:
তিতাস একটি নদীর নাম, যা অদ্বৈত মল্লবর্মণ (১৯১৪-১৯৫১) আমাদের শিখিয়েছিলেন আর ঋত্বিক ঘটক (১৯২৫-১৯৭৬) দেখালেন যে সেই নদী কীভাবে শুকিয়ে যায়।

তিতাস একটি নদীর নাম, যা অদ্বৈত মল্লবর্মণ (১৯১৪-১৯৫১) আমাদের শিখিয়েছিলেন আর ঋত্বিক ঘটক (১৯২৫-১৯৭৬) দেখালেন যে সেই নদী কীভাবে শুকিয়ে যায়। তথাপি একটা ছোট্ট দীর্ঘশ্বাস পুরো ছবিটাকে ঘিরে থাকে। দীর্ঘশ্বাসের বুকে আজীবন ট্যাটু করা: যদি।

কানে বাজে, অথচ পর্দায় উচ্চারিত হয় না।

যদি দেশভাগ না হতো, যদি নদীটা না মরত, যদি ঘটক সুস্থ শরীরে ছবিটা শেষ পর্যন্ত নিজের হাতে সম্পাদনা করতে পারতেন। এই শেষ ‘যদি’টা কল্পনা নয়: ছবির প্রচলিত সংস্করণটি বাংলাদেশেই সম্পাদিত হয়েছিল তাঁর লিখিত অনুমতিতে, ঘটক তখন হাসপাতালে।

তাই এ আলাপের নাম ‘তিতাস একটি যদির নাম’।

ঘটকের ঢাকা পর্বের সঙ্গে বাংলাদেশের ফিল্ম সোসাইটি আন্দোলনেরও একটি সুতো জড়ানো। ঘটক ঢাকায় ছবি বানাতে এলে আন্দোলনের পথিকৃৎ মোহাম্মদ খসরু৩ (১৯৪৬-২০১৯) তাঁর সঙ্গে দেখা করেন এবং একটি সাক্ষাৎকার নেন। খসরুর হিসাবে, ওই সাক্ষাৎকার ভারতে ১৫-১৬ বার ছাপা হয়েছে, জায়গা পেয়েছে ১৮টি সাক্ষাৎকার-সংকলনে। কেরেলায় খসরু দুটি চলচ্চিত্র সমবায়ের কাজ দেখে মুগ্ধ হন। ঘটকের দুই ছাত্র জন আব্রাহাম (১৯৩৭-১৯৮৭) এমনই এক সমবায় থেকে বানান তাঁর শেষ ছবি আর আদুর গোপালকৃষ্ণণের (১৯৪১-) প্রথম দুই ছবির পেছনে ছিল চাঁদায় গড়া চিত্রলেখা ফিল্ম কো–অপারেটিভ।

ছবিটা সম্ভব হয়েছিল আরেকটি ‘যদি’র জোরে: এক প্রযোজকের জেদ। হাবিবুর রহমান খান ১৯৬৩ সাল থেকে ঘটকের ভক্ত। বলতেন, কখনো প্রযোজক হলে ছবি বানাবেন তাঁকে দিয়েই। স্বাধীনতার পর হাবিবুর রহমানের আগ্রহেই ঘটক জন্মভূমিতে ফেরেন। লোকেশন দেখতে যান ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়, আরিচায়, নারায়ণগঞ্জের বৈদ্যের বাজারে। সিনেমার শুটিং শুরু ১৯৭২ সালের ১৬ জুলাই; মুক্তি পায় ১৯৭৩ সালের ২৭ জুলাই। ২ক্যামেরায় ছিলেন বেবী ইসলাম, যিনি পরে ঘটকের শেষ ছবি ‘যুক্তি তক্কো আর গপ্পো’ (১৯৭৭)-তেও কাজ করেন। রোজি সামাদ, কবরী, প্রবীর মিত্র, গোলাম মুস্তাফা, রওশন জামিলের মতো বাংলাদেশের শিল্পীরা অভিনয় করেছেন। ফকির লালন সাঁই, রাধারমণ দত্ত, সাধক আউয়াল ফকির, ধীরাজ উদ্দিন ফকির, গুরুচাঁদ গোসাই এবং আরও আরও লোকজ গান বেঁধে দিয়েছে ছবির ছন্দ। গল্পটা মালো জেলেদের: বিয়ের রাতে অপহৃত বধূ, উন্মাদ হয়ে যাওয়া স্বামী, অজান্তে সখী হয়ে ওঠা দুই নারী আর ধীরে ধীরে ফুরিয়ে আসা এক নদী। ওস্তাদ বাহাদুর হোসেন খান তাঁর সরোদবাদনের সুনিপুণ ছোঁয়ায় চলচ্চিত্রের বহমান আবহ সংগীতকে অত্যন্ত হৃদয়গ্রাহী ও বিষণ্ন রূপ দিয়েছেন, যা তিতাস নদের গতি ও জেলেদের জীবনের পলিমাটির মতো স্তরে স্তরে বিন্যাসিত।

ঋত্বিক ঘটক (৪ নভেম্বর ১৯২৫ – ৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৬)

ঘটকের ঢাকা পর্বের সঙ্গে বাংলাদেশের ফিল্ম সোসাইটি আন্দোলনেরও একটি সুতো জড়ানো। ঘটক ঢাকায় ছবি বানাতে এলে আন্দোলনের পথিকৃৎ মোহাম্মদ খসরু৩ (১৯৪৬-২০১৯) তাঁর সঙ্গে দেখা করেন এবং একটি সাক্ষাৎকার নেন। খসরুর হিসাবে, ওই সাক্ষাৎকার ভারতে ১৫-১৬ বার ছাপা হয়েছে, জায়গা পেয়েছে ১৮টি সাক্ষাৎকার-সংকলনে। কেরেলায় খসরু দুটি চলচ্চিত্র সমবায়ের কাজ দেখে মুগ্ধ হন। ঘটকের দুই ছাত্র জন আব্রাহাম (১৯৩৭-১৯৮৭) এমনই এক সমবায় থেকে বানান তাঁর শেষ ছবি আর আদুর গোপালকৃষ্ণণের (১৯৪১-) প্রথম দুই ছবির পেছনে ছিল চাঁদায় গড়া চিত্রলেখা ফিল্ম কো–অপারেটিভ। সেই দেখা থেকে তানভীর মোকাম্মেলের পরিচালনায় খসরু নিজের সংগঠনের স্বল্পদৈর্ঘ্য ছবির জন্য চাঁদা তোলেন, যদিও উদ্যোগটিকে তিনি নিজেই ব্যর্থ বলেছেন৪। ঘটকের সঙ্গে খসরুর সাক্ষাৎ সরাসরি ঘটলেও ঢাকার ফিল্ম সোসাইটির সম্পর্কের গ্রন্থিটা যেন আঁকাবাঁকা মেঠোপথের মতন।

ঘটকের মেলোড্রামাকে আরেক মেলোড্রামা নির্মাতার পাশে রেখেও পড়া যায়; রাইনার ভের্নার ফাসবিন্ডার (১৯৪৫-১৯৮২)। ভারতীয় সমালোচক শ্রীকান্ত শ্রীনিবাসন৭ ঘটকের মেলোড্রামাকে মিজোগুচি ও ফাসবিন্ডারের ব্যবহারের সঙ্গে তুলনা করেছেন। আর শোভনলাল চক্রবর্তী লিখেছেন৮, ডগলাস সির্ক (১৮৯৭-১৯৮৭) বা ফাসবিন্ডারের কৌশলে অভ্যস্ত পূর্বি বা পশ্চিমা দর্শকের কাছে ঘটকের ধরন অস্বস্তিকর হওয়ার কথা নয়। মিল সত্যিই আছে: দুজনই ব্রেখটের উত্তরসূরি, দুজনই স্বাভাবিকতার ভান ছেড়ে সচেতন কৃত্রিমতা বেছে নিয়েছেন।

‘তিতাস একটি নদীর নাম’ একটি খাঁটি মেলোড্রামা। ঘটক নিজেই দাবি করতেন যে মেলোড্রামা তাঁর জন্মগত অধিকার। এখানে মেলোড্রামা কোনো গালি নয়। এমনটাই মনে করেন চলচ্চিত্র–তাত্ত্বিক ও সমালোচক অ্যাড্রিয়ান মার্টিন৫। মার্টিনের যুক্তি, ঘটক ইচ্ছা করেই এর কলকবজা চড়িয়ে তোলেন: অবিশ্বাস্যভাবে কাকতালীয়, অতীত না জেনে গড়ে ওঠা বন্ধুত্ব, নিয়তির হাতে সঁপে দেওয়া মানুষ। যা কিছু ঘটনাকে চরিত্রের ইচ্ছার বাইরে ঠেলে দেয়, ঘটকের কাছে সে সবকিছুই রাজনৈতিকভাবে অর্থপূর্ণ। কেননা ইতিহাস যাদের মতামত চায়নি, তাদের জীবনে ঘটনা এভাবেই নাজিল হয়। ঘটক তাঁর সমসাময়িক নির্মাতাদের চেয়ে স্নায়ুতে টান ধরানো এবং আরও আমূল আধুনিক। আমরা আরও লক্ষ করি যে একটা জীবনযাত্রার মুছে যাওয়া দেখানোর সময়ও ছবিটা না ভাবালু, না নস্টালজিক। যেন বা প্রায় উদাসীন। অননুবর্তক।

মার্টিন তাঁকে বলেন ‘ছেদের কবি’৬। আমি বলি, যাতনার রতি।

তিতাস একটি নদীর নাম চলচ্চিত্রের একটি স্থির দৃশ্য

কেননা এই ‘ছেদ’ থেকেই জন্ম নেয় এক গভীর যাতনা। ট্র্যাজিক দেশভাগ, তীব্র মানসিক অবসাদ ও প্রাতিষ্ঠানিক অবহেলায় জর্জরিত এক বিষাদময় অধ্যায়। যেমন তাঁর চলচ্চিত্রের কুশীলবেরা। এই ব্যক্তিগত ও সামাজিক যাতনাকেই তিনি তাঁর ‘দেশভাগ ত্রয়ী’সহ বিভিন্ন চলচ্চিত্রে উদ্বাস্তুজীবনের হাহাকার ও চরিত্রের আত্মিক যন্ত্রণার মাধ্যমে সেলুলয়েডে ফুটিয়ে তুলেছিলেন। মেলোড্রামা ও তীব্র শব্দের শৈল্পিক ব্যবহারে সেই কষ্টকে এক মহাকাব্যিক উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার যাতনাই হয়ে উঠেছিল তাঁর শিল্পের প্রধান সৌন্দর্য ও পরম চালিকা শক্তি বা ‘রতি’।

ঘটকের মেলোড্রামাকে আরেক মেলোড্রামা নির্মাতার পাশে রেখেও পড়া যায়; রাইনার ভের্নার ফাসবিন্ডার (১৯৪৫-১৯৮২)। ভারতীয় সমালোচক শ্রীকান্ত শ্রীনিবাসন৭ ঘটকের মেলোড্রামাকে মিজোগুচি ও ফাসবিন্ডারের ব্যবহারের সঙ্গে তুলনা করেছেন। আর শোভনলাল চক্রবর্তী লিখেছেন৮, ডগলাস সির্ক (১৮৯৭-১৯৮৭) বা ফাসবিন্ডারের কৌশলে অভ্যস্ত পূর্বি বা পশ্চিমা দর্শকের কাছে ঘটকের ধরন অস্বস্তিকর হওয়ার কথা নয়। মিল সত্যিই আছে: দুজনই ব্রেখটের উত্তরসূরি, দুজনই স্বাভাবিকতার ভান ছেড়ে সচেতন কৃত্রিমতা বেছে নিয়েছেন।

বাংলাদেশে সেই ভাবনার উত্তরাধিকার ছড়িয়েছে নানা পথে।। যেমন মনে করা যাক, জাতীয় চলচ্চিত্র পদক ও অনুদানপ্রাপ্ত নির্মাতা, চিত্রনাট্যকার, চলচ্চিত্র সংসদকর্মী নুরুল আলম আতিকের (১৯৬৯- ) কথা। তিনি চলচ্চিত্র নিয়ে যেখানে পড়াশোনা করেছেন, ঘটক সেখানে পড়িয়েছিলেন। আতিক গিয়ে হয়তো ঘটকের অশরীরী ছায়ার দেখা পেয়েছিলেন ক্যাম্পাসের বোধিবৃক্ষের তলে। আতিকের পয়লা সিনেমা ‘ডুবসাঁতার’ (২০১০) নির্মাণের সময় ঘটকীয় ভাবনার সেই প্রত্যাবর্তনের কথা উল্লেখ করা যায়১১। একসময় ঋত্বিক ঘটকের চলচ্চিত্রে বুঁদ হয়ে থাকা আতিক নিজস্ব মৌলিকত্ব ধরে রাখতে গিয়ে কিছুটা দূরে সরে গেলেও ‘ডুবসাঁতার’-এর রেণু (জয়া আহসান) চরিত্রটির মনস্তত্ত্ব নির্মাণে তিনি আবারও ঘটকের বাঙালি সম্পর্ক ও নারীত্বের দর্শনে ফিরে যান।

ফারাকও স্পষ্ট।

ফাসবিন্ডারের মেলোড্রামা ঠান্ডা, সাজানো, বন্ধ ঘরের ভেতরে ঘটে, যেমন ‘আলি: ফিয়ার ইটস দ্য সোল’ (১৯৭৪)-এ ঘটে থাকবে। আর সেখানে দুজন মানুষের সম্পর্কের ফাটলে ধরা পড়ে সমাজ ও তার অসঙ্গতি। ঘটকের মেলোড্রামা খেলা করে খোলা আকাশের নিচে, নদী আর লোকগানের সঙ্গে, আর সেখানে আঘাতটা আছড়ে পড়ে একটা সম্প্রদায়ের যাপনে, একটা ইতিহাসের গতরে।

ঘটকের আরেক প্রখ্যাত ছাত্র মণি কাউল মেলোড্রামাকে মহাকাব্যের কাছাকাছি ধরেন৯। কাউলের মেলোড্রামাটিক আগ্রহের স্থিতিবিন্দু আখ্যানের কার্যকারণে নেই। নেই চরিত্র গড়ায় তাঁর আগ্রহ। তাঁর টান ঘটনার বিস্তারে। তাঁর মতে, ঘটক মেলোড্রামাকে ব্যবহার করেন মাধ্যম হিসেবে। দ্রষ্টব্য হিসেবে নয়। আর তিতাসের মূল কথা: সম্পর্কমাত্রই মরণশীল, সভ্যতা মরে না। তিতাস বা যেকোনো নদীর শুকনো তলায় ধান ফললে আরেকটি সভ্যতার নবজন্ম হয়। মার্টিনের অভাবালু বিলুপ্তি আর কাউলের নবজন্ম পাশাপাশি রাখলে ছবির শেষটা একটা প্রশ্ন হয়ে কাঁদে—খটখটে নদীর তলায় ধানখেতের সম্ভাবনা কি সান্ত্বনা, নাকি অভিযোগ?

তিতাস একটি নদীর নাম চলচ্চিত্রের একটি স্থির দৃশ্য

ঘটক উত্তর দেন না। ঋত্বিক শর্তটা রেখে যান।

ঘটকের এই জীবনের শেষ ছবি ‘যুক্তি তক্কো আর গপ্পো’য় নিজের ছায়াচরিত্র নীলকণ্ঠ বাগচীর মুখে একটি স্মরণীয় বাক্য আছে: ‘ভাবো, ভাবো, ভাবা প্র্যাকটিস করো।’ মনে রাখা ভালো, ঘটকের ডাকনাম ‘ভবা’। ভবা ও ভাবা ব্যাকরণগতভাবে দুটো শব্দই সংস্কৃত ‘ভূ’ ধাতুজাত। যার অর্থ ‘হওয়া’ বা ‘বিদ্যমান থাকা’। যা–ই হোক, ভাবনা এখানে প্রতিভাস নয়। অভ্যাস। পেশির মতো খাটাতে হয়। এ কথাই ঘটকের শিল্পদর্শনের মর্ম। তাঁর বিশ্বাস ছিল, পর্দায় যা চলমান, তা ছায়াচিত্রমাত্র; আসল সিনেমা ঘটে দর্শকের মস্তিষ্কের থিয়েটারে।

পুনের ফিল্ম ইনস্টিটিউটে অল্প সময়ের শিক্ষকতায় ঘটক ভাবার অভ্যাসই শিখিয়েছিলেন আর তাঁর ছাত্র মণি কাউল, কুমার সাহানি, জন আব্রাহামেরা পরে ভারতীয় নয়া তরঙ্গের চেহারা গড়েছেন, হিন্দি সিনেমার সমান্তরালে। এমতাবস্থায় বলতেই হয়ে যে ‘যদি’ আসলে ভাবনারই শর্তসাপেক্ষ রূপ। অর্থাৎ যা ঘটেনি, তাকে ভাবতে শেখা।

বাংলাদেশে সেই ভাবনার উত্তরাধিকার ছড়িয়েছে নানা পথে।। যেমন মনে করা যাক, জাতীয় চলচ্চিত্র পদক ও অনুদানপ্রাপ্ত নির্মাতা, চিত্রনাট্যকার, চলচ্চিত্র সংসদকর্মী নুরুল আলম আতিকের (১৯৬৯- ) কথা। তিনি চলচ্চিত্র নিয়ে যেখানে পড়াশোনা করেছেন, ঘটক সেখানে পড়িয়েছিলেন। আতিক গিয়ে হয়তো ঘটকের অশরীরী ছায়ার দেখা পেয়েছিলেন ক্যাম্পাসের বোধিবৃক্ষের তলে। আতিকের পয়লা সিনেমা ‘ডুবসাঁতার’ (২০১০) নির্মাণের সময় ঘটকীয় ভাবনার সেই প্রত্যাবর্তনের কথা উল্লেখ করা যায়১১। একসময় ঋত্বিক ঘটকের চলচ্চিত্রে বুঁদ হয়ে থাকা আতিক নিজস্ব মৌলিকত্ব ধরে রাখতে গিয়ে কিছুটা দূরে সরে গেলেও ‘ডুবসাঁতার’-এর রেণু (জয়া আহসান) চরিত্রটির মনস্তত্ত্ব নির্মাণে তিনি আবারও ঘটকের বাঙালি সম্পর্ক ও নারীত্বের দর্শনে ফিরে যান। আত্মবিসর্জনের মুখোমুখি দাঁড়িয়েও নারীর নিজ শরীরের প্রতি হঠাৎ সচেতন হয়ে ওঠা এবং নিজেকে নিঃশেষ হতে না দেওয়ার যে তাড়না, তা ফুটিয়ে তুলতে ঘটকের নারীভাবনাই ছিল তাঁর মূল প্রেরণা। কেবল বিষয়বস্তুতেই নয়, সংগীতেও তিনি ঘটকের প্রত্যক্ষ ঋণ স্বীকার করেছেন; ঘটক তাঁর ‘সুবর্ণরেখা’ (১৯৬৫) ছবিতে রনেন রায় চৌধুরীর কণ্ঠে গোপাল গোঁসাইয়ের যে গানের কয়েকটি লাইন (‘কলঙ্ক রবে নামে...’) তুলে এনেছিলেন, আতিক সেই ‘আমার দেহ তরী ছাইড়া দিলাম গুরু তোমারই নামে’ গানটিকেই পূর্ণাঙ্গভাবে কণ্ঠশিল্পী সুমেল চৌধুরীকে দিয়ে রেকর্ড করিয়ে নিজের চলচ্চিত্রে ব্যবহার করেন।

তিতাস একটি নদীর নাম চলচ্চিত্রের একটি স্থির দৃশ্য

ভাবনার পাশাপাশি ঘটকের হাতে কারুকাজও আছে, আর তাকে সেদিক থেকে পড়া হয় কম। বুজুর্গ তাত্ত্বিক ডেভিড বর্ডওয়েলের পোয়েটিকস অব ফিল্মের পথে হেঁটে প্রশ্ন করা যায়, ছবিটা কোন উপকরণ, কোন শর্ত আর কোন অভ্যাসের ভেতর দিয়ে তৈরি হলো। ‘তিতাস’-এর ক্ষেত্রে উত্তরগুলো মোটামুটি নথিভুক্ত। প্রযোজক হাবিবুর রহমান খানের স্মৃতিকথা অনুযায়ী ছবির বাজেট ছিল আট লাখ চব্বিশ হাজার টাকা। সাদাকালো ছবি। ঘটক বিশ্বাস করতেন১২, সিনেমা বানাতে প্রথাগত অভিনেতার চেয়ে পরিচালকের নির্মাণভাবনাই মুখ্য; তাঁর কাছে ফ্রেমের অন্যান্য প্রপস বা আসবাবের মতোই অভিনেতা ছিলেন কেবল ‘লাইভ মুভিং প্রপার্টি’ বা জীবন্ত চলমান উপাদান। সেটে জ্যামিতিক নির্দেশনার মাধ্যমে চোখের চাহনি কিংবা তাকানোর ভঙ্গি নিয়ন্ত্রণ করে তিনি প্রমাণ করতেন, চলচ্চিত্রে অভিনেতা মূলত পরিচালকেরই সূক্ষ্ম নির্দেশনার বাস্তবায়ন ঘটান। মঞ্চনাটকে অভিনয়শিল্পী লাইভ পারফরম্যান্সের মাধ্যমে একবারে সব ঢেলে দেওয়ার সুযোগ পান, কিন্তু সিনেমায় ‘কাট’ ও বারবার ‘টেক’ নেওয়ার সুযোগ থাকায় পুরো অভিনয়টা শেষ পর্যন্ত পরিচালকের হাতেই রূপ নেয়। এ মৌলিক পার্থক্যের কারণেই ঘটক মনে করতেন, বিশ্বজুড়ে সত্যিকারের ‘চলচ্চিত্রের অভিনেতা’র সংখ্যা বস্তুত অত্যন্ত সীমিত। ১৯৭২-এ ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় শুটিংয়ের সময় ঘটকের একটি জেনারেটর দরকার পড়েছিল। প্রযোজক হাবিবুর রহমান খানের স্মৃতিতে, যুদ্ধবিধ্বস্ত নতুন দেশে তখন ট্রলিতে বসানো একটিই জেনারেটর ছিল, সদ্য স্বাধীন দেশের রাষ্ট্রপতির দপ্তরের বিকল্প বিদ্যুতের জন্য রাখা। সেই জেনারেটর কীভাবে লোকেশনে এসে পৌঁছেছিল, সেটা আরেক গল্প। এসব উপকরণের ভেতরই ঘটকের পদ্ধতি পড়তে হয়।

ফিরে আসি আবার ‘তিতাস’–এর ভেতর। অথচ ছবিটা মুক্তির সময় ব্যবসা করেনি, আলমগীর কবিরের মতো সমালোচক ছিলেন কঠোর১৫। ২০০৭ সালে বিএফআইয়ের জরিপে সেই ছবিই উঠে এসেছে সেরা ১০ বাংলাদেশি ছবির শীর্ষে, আর ২০১০ সালে মার্টিন স্করসেজির ওয়ার্ল্ড সিনেমা প্রজেক্ট ‘তিতাস’–এর পুনরুদ্ধৃত ডিজিটাল সংস্করণ তৈরি করেছে। ভারতীয় নির্মাতা/বাংলাদেশি প্রযোজকের করা এ ছবি ভারত-বাংলাদেশের যৌথ প্রযোজনার ফসল নয়। এটি স্পষ্ট হওয়াটা জরুরি।

মার্টিনের বিবরণ অনুযায়ী ঘটকের নকশা শুরু হতো চিত্রনাট্যের সাহিত্যিক ধারণা থেকে নয়, ছবির ‘ফিল্মিক ট্রিটমেন্ট’ থেকে, যেখানে শব্দ আর নৈঃশব্দ্য গোড়া থেকেই হিসাবে ধরা আর ‘আকস্মিক ছেদ’ বা ‘রাপচার’ কাজ করে ফ্রেমের সঙ্গে ধ্বনিক হস্তক্ষেপ মিলিয়ে১৩। নিজের আর্কিটাইপ-নির্ভর পদ্ধতির ব্যাখ্যায় ঘটক জোসেফ ক্যাম্পবেলের মাস্কস অব গড টেনেছিলেন১৪, আর উপাদান নিয়েছিলেন লোকগান, বাউল, খেয়াল ও বৌদ্ধ ভাস্কর্য থেকে। ‘তিতাস’-এ নাম প্রচলিত বাংলার লোকগান, জারিগান, ভাটিয়ালি ও ঐতিহ্যবাহী কীর্তন সুর এঁটে দেয় রিদম ও মুভমেন্টের জামা ও পায়জামা। প্রশ্ন থেকে যায়, ছবির খণ্ডিত গড়নের কতটা ঘটকের নকশা বা প্রোডাকশন ডিজাইন, কতটা টানাটানির ছাপ আর কতটা অসম্পূর্ণ সম্পাদনার ফল। জাম্প কাট আর রাপচার তাঁর আগের ছবিতেও ছিল, তাই অন্তত খানিকটা ক্রিয়েটিভ নকশার অংশ, সেটা বলাই বাহুল্য। বাকিটা উত্তরহীন।

১৯৭৫ সালে প্রবীর সেনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন১০, ‘আমি পাগল, চলচ্চিত্র তৈরি না করেই বাঁচতে পারি না।’ তাঁর একমাত্র বিষয়, ‘আমার দেশের নর ও নারী’। মানবতার জন্য ভালো কিছু না করলে কোনো শিল্পই শিল্পের কাজ করে না, আর ‘শিল্প একটি তুচ্ছ জিনিস নয়’। ফর্ম নিয়ে প্রশ্নের জবাবে তাঁর কথা ছিল, ফর্ম আসে শিল্পীর থিম আর দর্শন থেকে: ‘বিষয়বস্তু এটাই নির্দেশ করে’। মেলোড্রামা তাই তাঁর কাছে রুচির প্রশ্ন নয়, বিষয়ের দাবি। কাজকে তিনি ভালোবাসার সঙ্গেও বেঁধেছেন। বলেছেন: ‘[কাজ কে] পাগলের মতো ভালবাসতে হবে।’ তাই মার্টিন যাকে মেলোড্রামার হিস্টিরিয়া বলেন, ঘটকের নিজের কথায় তার আরেক নাম ‘পাগল করা ভালোবাসা’।

ফিরে আসি আবার ‘তিতাস’–এর ভেতর। অথচ ছবিটা মুক্তির সময় ব্যবসা করেনি, আলমগীর কবিরের মতো সমালোচক ছিলেন কঠোর১৫। ২০০৭ সালে বিএফআইয়ের জরিপে সেই ছবিই উঠে এসেছে সেরা ১০ বাংলাদেশি ছবির শীর্ষে, আর ২০১০ সালে মার্টিন স্করসেজির ওয়ার্ল্ড সিনেমা প্রজেক্ট ‘তিতাস’–এর পুনরুদ্ধৃত ডিজিটাল সংস্করণ তৈরি করেছে। ভারতীয় নির্মাতা/বাংলাদেশি প্রযোজকের করা এ ছবি ভারত-বাংলাদেশের যৌথ প্রযোজনার ফসল নয়। এটি স্পষ্ট হওয়াটা জরুরি।

তিতাস একটি নদীর নাম চলচ্চিত্রের একটি স্থির দৃশ্য

ঘটক এখন বাংলাদেশের সমকালীন নির্মাতাদের ছবিতেও ফিরে আসছেন, কখনো বিষয় হয়ে, কখনো প্রতিধ্বনি হয়ে। মোল্লা সাগরের ‘ভবার ভিটা’ (২০২৫) ঘটকের আদিবাড়ির খোঁজে পুরান ঢাকার গলিতে ঘোরে। ২০১৪ থেকে ২০১৭ পর্যন্ত তোলা আড়াই শতাধিক ঘণ্টার ফুটেজ থেকে বেরিয়েছে ত্রিশ মিনিটের ছবি, যার মূল অবলম্বন ঘটকের যমজ বোন প্রতীতি দেবীর স্মৃতি। অনেক বাসিন্দা সেখানে কথা বলতে চাননি বা ঘটকের নামই শোনেননি আর ডেইলি স্টারের সমালোচক সেই নীরবতাকে জুড়েছেন দেশভাগ আর ১৯৬৫ সালের শত্রু সম্পত্তি আইনের পরের টানাপোড়েনের সঙ্গে। সমালোচকের অভিযোগ ছিল, ছবিটা রাজনীতি না ছুঁয়ে হঠাৎ থেমে যায় আর সাগর বলেছেন, তিনি ছবিটাকে অরাজনৈতিক রাখতে চেয়েছিলেন১৬। তবু বিষয়টা ঘটকেরই: ঘর, স্মৃতি, উৎখাত।

নাঈম মোহাইমেনের নির্মাণের সঙ্গে ঋত্বিক ঘটকের সংযোগটি সরাসরি অনুকরণের নয়, বরং এক গভীর ডায়ালগ বা প্রতিধ্বনির১৭। মোহাইমেনের চলচ্চিত্র ‘আ মিসিং ক্যান অব ফিল্ম’ (২০২৫)-এ এফডিসির সিঁড়ি দিয়ে ক্যামেরা উঠে যাওয়ার সময় জহির রায়হান (১৯৩৫-?) ও সত্যজিৎ রায়ের ছবির পাশে সিনেমার পর্দায় লিখে প্রস্তাব করা হয় যে জহির রায়হানের পাশে সত্যজিতের চেয়ে ‘ক্রদ্ধ’ ঘটককে রাখাই বেশি প্রাসঙ্গিক হতো। এ ছবিতে ২০২৪ সালে এফডিসিতে ধারণ করা থমথমে বাস্তবতার দৃশ্যের সঙ্গে জহির রায়হানের চলচ্চিত্রের স্প্লিট-স্ক্রিন কোলাজ মিলিয়ে দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, মোল্লা সাগরের ‘ভবার ভিটা’ চলচ্চিত্রে সাবটাইটেল করতে গিয়ে মোহাইমেন অনুধাবন করেন যে জহির রায়হান ও ঋত্বিক ঘটক উভয়ের স্মৃতিই কীভাবে হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে। জহির রায়হানের অসমাপ্ত চলচ্চিত্র ‘লেট দেয়ার বি লাইট’ (১৯৭০)-এর অপ্রাপ্তি কিংবা হারানো ক্যানের সংকেত, ২০২৪-এর আন্দোলন-পরবর্তী অস্থিরতায় রাজশাহীতে ঋত্বিক ঘটকের পৈতৃক বাড়ি ধ্বংস হয়ে যাওয়া এবং আমাদের চলচ্চিত্র ইতিহাসের হারিয়ে যাওয়া রিল ও অলক্ষে চলে যাওয়া নির্মাণগুলো যেন একই বিষাদবৃক্ষের শাখা-প্রশাখা।

তিতাস একটি নদীর নাম চলচ্চিত্রের একটি স্থির দৃশ্য

আজ ঢাকায় ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ দেখতে বসলে প্রারম্ভের ‘যদি’টা আরও ভারী হয়ে ওঠে। আমাদের নদীগুলোর দখল, দূষণ আর ভরাটের খবর এখন এত পুরোনো যে খবর হিসেবেই আর চমকায় না। ঋত্বিক ঘটক জন্মেছিলেন ১৯২৫ সালের ৪ নভেম্বর, ঢাকায়। রাজশাহীতে তাঁর ছোটবেলার বাড়িটিও ২০২৪ সালে স্থানীয় লোকজনের হাতে ভেঙে ফেলা হয়েছে, ২০১৭ সালে সংরক্ষণের আবেদন সত্ত্বেও১৮। যে মানুষ বাংলার ভাগ হওয়া ঘর নিয়ে ছবি বানালেন, তাঁর নিজের ঘর আজ নেই। ১০১ বছর পর তাঁকে স্মরণ করার সবচেয়ে সৎ উপায় সম্ভবত শ্রদ্ধা/জল/পুষ্প বা স্বর্ণাঞ্জলি নয়, তাঁর ‘যদি’গুলোকে নিজেদের প্রশ্ন বানিয়ে নেওয়া: নদী বাঁচানোর যদি, সিনেমা ও সিঙ্গেল স্ক্রিন সিনেমা হল রক্ষার যদি, ভাগ হয়ে যাওয়া বাংলাকে ঋত্বিকের ভাষায় ভাবতে পারার যদি। তিতাস একটি নদীর নাম, এ কথা সবাই জানে। সে যে একটি যদির নামও, তা আর কয়জনের স্মরণে থাকে!

আর এই যদির মানে যদি হয় ‘ভাবা প্র্যাকটিস করা’, তবে সেটা মনে করিয়ে দেওয়াই ঘটকের কাজ।

ঋত্বিক ঘটক

ইমরান ফিরদাউস

ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ (আইইউবি)-এ অধ্যাপনা ও গবেষণা করেন।

দোহাই লাগে

১| ইসলাম, কা.ন. (১৯২৩). রাজবন্দীর জবানবন্দী, অনুশীলন

২| পিয়াস, র. গা. (২০১৬, ২২ জুলাই), আমি ছাড়া তিতাস হতো না, কালের কণ্ঠ.

৩| আলাউদ্দিন, রা. (২০১৯, ১১ মার্চ). মুহম্মদ খসরু: ৪৩ বছর চলে গেল দেশ স্বাধীন হইছে, একটা ভাল উপন্যাস লেখা হইছে? বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

৪| প্রাগুক্ত

৫| Martin, A. (2013, August). A River Called Titas [Review of the film A River Called Titas]. Adrian Martin: Film Critic

৬| প্রাগুক্ত

৭| Hudson, D. (2019, October 31). Ritwik Ghatak, non-conformist. The Criterion Collection

৮| Chakraborty, S. (2024, December 14). Rebel with a cause. MillenniumPost

৯|Kabir, N. M. (2016, September 15). Mani Kaul interview on Ritwik Ghatak is a lesson in appreciating 'Titas Ekti Nadir Naam' and cinema. Scroll.in

১০| সেন, প্র. (১৯৮৮). ঋত্বিক কুমার ঘটকের সাক্ষাৎকার (১৯৭৫). অ. পাল (সম্পা.), ঋত্বিক কুমার ঘটক. বাণীশিল্প.

১১| ফিরদাউস, ই. (২০১৩, ২৮ জুন). আতিকের খোঁজে ঋত্বিক অথবা এবাদ-আতিক সংলাপিকা (২য় কিস্তি),লাল জীপের ডায়েরী

১২| পিয়াস, র. গা. (২০১৬, ২২ জুলাই), আমি ছাড়া তিতাস হতো না, কালের কণ্ঠ

১৩| Martin, A. (2013, August). A River Called Titas [Review of the film A River Called Titas]. Adrian Martin: Film Critic

১৪| Ghatak, R. (1987). Cinema and I. Ritwik Memorial Trust.

১৫| Kabir, A. (2001). Bad Name: Titas Ekti Nadir Nam. In S. Awwal (Ed.), Ritwikmongal. Bangla Academy.

১৬| Ramim, F. (2025, October 11). Counter Foto exhibits Molla Sagar's documentary film on Ritwik Ghatak. The Daily Star

১৭| Mohaiemen, N. (2026, February 1). Raihan-Ghatak-Tarkovsky: We shall search, we shall find. The Daily Star

১৮| Arts & Entertainment Desk. (2024, August 14). Ritwik Ghatak's ancestral home demolished in Rajshahi. The Daily Star

সূত্র: প্রথম আলো