জনশূন্য পূর্বাচলে পড়ে আছে রাজউকের ২৫ কোটি টাকার কাঁচাবাজার
গণমাধ্যম ডেক্স
তিন দশকেরও বেশি সময় আগে শুরু হওয়া পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে এখনো গড়ে ওঠেনি প্রত্যাশিত জনবসতি। নিশ্চিত হয়নি প্রয়োজনীয় নাগরিক সুবিধাও। অথচ প্রায় ২৫ কোটি টাকা ব্যয়ে দুটি আধুনিক কাঁচাবাজার নির্মাণ করেছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)।
নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে প্রায় ছয় মাস আগে। তবে এখনো শুরু হয়নি বেচাকেনা। ক্রেতা নেই, বিক্রেতাও নেই। জনবসতি গড়ে ওঠার আগেই বিপুল অর্থ ব্যয়ে বাজার নির্মাণের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন নগর পরিকল্পনাবিদরা।
রাজধানীর অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপ কমিয়ে পরিকল্পিত নগর গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে ১৯৯৫ সালে শুরু হয় পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্প। ৬ হাজার ২২৭ একর জমির ওপর বাস্তবায়নাধীন এ প্রকল্পে এখনো রয়েছে জনবসতি ও নাগরিক সুবিধার সংকট। চারপাশে বিস্তীর্ণ খোলা মাঠ, বুনো ঘাসের জঙ্গল আর অপর্যাপ্ত সড়ক যোগাযোগের কারণে সন্ধ্যার পর চলাচলও কঠিন হয়ে পড়ে। পানি, গ্যাস, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও চিকিৎসাকেন্দ্রের মতো মৌলিক নাগরিক সুবিধাও এখনো পর্যাপ্ত নয়।
এমন পরিস্থিতিতে পূর্বাচলের ১ ও ৫ নম্বর সেক্টরে নির্মাণ করা হয়েছে দুটি দোতলা কাঁচাবাজার। প্রতিটি বাজারে রয়েছে ৭৮টি করে দোকান। সরেজমিনে দেখা গেছে, বাজার দুটির আশপাশে উল্লেখযোগ্য জনবসতি নেই। দোকানগুলো পড়ে আছে খালি। দীর্ঘদিন অব্যবহৃত থাকায় ভবনের বিভিন্ন অংশে জমেছে ধুলাবালি, লোহার সিঁড়িতে ধরতে শুরু করেছে জং।
সেক্টর-৫-এর বাজারটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যমেলার ভবনের বিপরীত পাশে নির্মাণ করা হয়েছে। বাজারটির সামনের সড়কের বিভিন্ন স্থানে জমে আছে কাদা-পানি। চারপাশে গজিয়েছে ঝোপঝাড়।
অন্যদিকে, সেক্টর-১-এর বাজারটির আশপাশেও নেই উল্লেখযোগ্য জনবসতি। ৩০০ ফিট সড়কের দক্ষিণ পাশে নির্মিত এ বাজারের কয়েক মিটার দূরেই মাজার রোডের মুখে রয়েছে একটি অস্থায়ী বাজার।
তারেক হাসান অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটস লিমিটেডের নকশায় স্টিল স্ট্রাকচারে বাজার দুটির নির্মাণকাজ করেছে সেনা কল্যাণ সংস্থা। এতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ২৫ কোটি টাকা। নির্মাণ শেষ হলেও বাজার দুটি চালু না হওয়ায় নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করছেন আনসার সদস্যরা।
এ বিষয়ে পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (পূর্ত সার্কেল-৩) খন্দকার মো. ওয়াহিদ সাদিক বলেন, প্লট মালিকরা দীর্ঘদিন ধরে বাজার-ঘাট না থাকায় ভবন নির্মাণে আগ্রহ দেখাচ্ছিলেন না। এ কারণে বাজারের আশপাশে ভবন নির্মাণের মাধ্যমে ভবিষ্যতে জনবসতি গড়ে উঠবে- এমন প্রত্যাশা থেকেই বাজার দুটি নির্মাণ করা হয়েছে।
তিনি বলেন, বাজার দুটি মহাসড়কের পাশে নির্মাণ করা হয়েছে, যাতে পূর্বাচলের ভেতরে বসতি কম থাকলেও বাইরের মানুষ কেনাকাটা করতে পারেন। বাজার বরাদ্দের জন্য প্রতিটিতে ৪০ থেকে ৫০টি দরপত্র জমা পড়েছে। একটি বাজারের জন্য মাসিক প্রায় ১১ লাখ এবং অন্যটির জন্য প্রায় ৯ লাখ টাকা পর্যন্ত ভাড়া দেওয়ার আগ্রহ দেখিয়েছেন আবেদনকারীরা। বরাদ্দপ্রাপ্তদের সঙ্গে তিন বছরের চুক্তি হবে এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে দোকান চালু করতে হবে।
তবে পূর্বাচলে জনবসতি গড়ে তোলার আগে বাজার নির্মাণকে কার্যকর উদ্যোগ মনে করছেন না নগর পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান। তিনি বলেন, মানুষ থাকলে স্বাভাবিকভাবেই বাজার গড়ে ওঠে। আগে বাজার নির্মাণ করে জনবসতি গড়ে তোলা যায় না। এর আগে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, পানি-বিদ্যুৎ সরবরাহ ও কর্মসংস্থানের মতো নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, মানুষ না থাকলে বাজারের ক্রেতা কারা হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। পরিকল্পিতভাবে কাজ না করলে প্রায় ২৫ কোটি টাকা ব্যয়ের বাজারগুলোও একসময় অব্যবহৃত থেকে যেতে পারে। এতে অর্থের পাশাপাশি অবকাঠামোরও অপচয় হবে।
তিন দশকের প্রকল্প, ব্যয় বাড়ছেই
১৯৯৫ সালে শুরু হওয়া পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পের প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ৩ হাজার ৩১২ কোটি টাকা। দফায় দফায় সংশোধনের পর মূল আবাসন অবকাঠামোয় ব্যয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ৮ হাজার থেকে ১০ হাজার ৩২৯ কোটি টাকা।
এদিকে অসমাপ্ত রাস্তা, পার্ক, ধর্মীয় উপাসনালয় ও ভূমি উন্নয়নসহ বিভিন্ন কাজ শেষ করতে নতুন করে প্রায় ৮ হাজার ৮৭০ কোটি টাকার রূপরেখা ও উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) প্রস্তুত করেছে রাজউক। আগের ব্যয়ের সঙ্গে নতুন এ অর্থ যুক্ত হলে প্রকল্পটির মোট ব্যয় প্রায় ১৭ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছানোর আশঙ্কা রয়েছে।
সূত্র: নতুন আরএসএস সোর্স