আন্তর্জাতিক শ্রমবাজার সমৃদ্ধিতে বাউবি হতে পারে একমাত্র নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠান
গণমাধ্যম ডেক্স
পৃথিবীজুড়ে দূরশিক্ষণ আজ হয়ে উঠেছে অগণিত মানুষের নতুন আশার আলো। জীবনের নানা টানাপোড়েনে একসময় অনেকেই পড়াশোনা থেকে দূরে সরে গিয়েছিলেন। নিজের স্বপ্ন আর আত্মপরিচয় ফিরে পাওয়ার তীব্র আকুলতায় তারাই আবার হাতে তুলে নিচ্ছেন বই। নতুন করে জানার অদম্য তৃষ্ণার কাছে আজ বয়স কোনো সীমানা নয়, এমনকি চলমান পেশাও কোনো বাধা নয়। জীবনকে নতুন করে গড়ার এক অপূর্ব প্রত্যয় আজ দূরশিক্ষণ শিক্ষা কার্যক্রমের কাছে। এই প্রত্যয় পূরণে বর্তমানে আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া, এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, আমেরিকা সহ বিশ্বের ১০৬টি দেশে উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় চালু আছে।
প্রতিবছর প্রায় দুই লাখের কাছাকাছি নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য বাংলাদেশ থেকে শান্তিরক্ষা মিশনে দেশের বাইরে যান। এদের বড় একটি অংশ দূরশিক্ষণ বা বাউবি’র শিক্ষার্থী। বর্তমানে সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী এবং বিমান বাহিনীর বিভিন্ন সেন্টারে এই শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। ২০১৪ থেকে ২০২৫ পর্যন্ত নিস-১ প্রোগ্রামে প্রায় ৫০ হাজার শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছে। নৌবাহিনীর জন্য আইসিটি, বিমান বাহিনীর জন্য আইসিটি এবং সামুদ্রিক ভূগোল নামে বিশেষায়িত কোর্সসমূহ চালু রয়েছে। বাউবির এই পাঠদান পদ্ধতি বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাহিনীর অন্যান্য সদস্যসহ শান্তিরক্ষী মিশনে যোগদানকারী সদস্যদের করেছে দক্ষ ও আত্মমর্যাদাশীল। এই ধারাবাহিকতায় গত ১১ মার্চ Bangladesh Institute of Peace Support Operation Training (BIPSOT)-এর সঙ্গে বাউবির এমওইউ (MoU) স্বাক্ষরিত হয়েছে।
বিশ্বের ১৭২টি দেশের শ্রমবাজারে চাকরি করার জন্য বাংলাদেশি শ্রমিকরা সেসব দেশে গমন করেন। প্রতিবছর ১০ লাখের বেশি শ্রমিক বিশ্ব-শ্রমবাজারে নিয়োজিত হন। সবচেয়ে বৃহৎ শ্রমবাজার হলো মধ্যপ্রাচ্য। প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যান অনুযায়ী বর্তমানে উপসাগরীয় ছয় দেশের মধ্যে সৌদি আরবে প্রায় ২০ লাখ, সংযুক্ত আরব আমিরাতে ১০ লাখ, ওমানে ৭ লাখ, কাতারে ৪ লাখ ৫০ হাজার, বাহরাইনে এক লাখ ৫০ হাজার ও কুয়েতে এক লাখ ৪০ হাজার বাংলাদেশি কর্মী রয়েছেন। উল্লেখ্য যে, রেমিট্যান্স অর্থাৎ প্রবাসী আয়ের প্রায় অর্ধেক আসে মধ্যপ্রাচ্যের মাত্র এই ছয়টি দেশ থেকে।
এতো বৃহৎ সুযোগে অবস্থান করেও বর্তমানে আমাদের ভাবতে হচ্ছে, আমরা কী তা ধরে রাখতে পারব! মূলত সামনের দিনগুলো বেশ চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠতে যাচ্ছে! শ্রমিক রপ্তানিকারক দেশগুলোর সঙ্গে আমাদের যে প্রতিযোগিতা চলছে, সেখানে আমরা কতটুকু কী বিচক্ষণতার পরিচয় দিচ্ছি! স্বল্পশিক্ষা, অদক্ষতা ও সনদহীন পরিচয় আমাদের শ্রমিকদের প্রতিনিয়ত বিপদে ফেলছে। ভারত, পাকিস্তান, চীনসহ অন্যান্য দেশের শ্রমিকদের চেয়ে কমদামে বিক্রি হচ্ছে আমাদের শ্রমিকদের শ্রম। এই অবস্থা থেকে দ্রুততর সময়ের মধ্যে বেরিয়ে আসা একান্ত জরুরি।
বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়নের জন্য শ্রমিকদের কারিগরি দক্ষতা অবশ্যই বাড়াতে হবে। মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে এদের সবার আগে বাড়াতে হবে ভাষা, তথ্যপ্রযুক্তি ও বাস্তব কাজের জ্ঞানকে। মনে রাখতে হবে, দক্ষ শ্রমিক পাঠাতে না পারলে ভবিষ্যতে এদেশের রেমিট্যান্স হুমকির মধ্যে পড়ে যাবে। অদক্ষ শ্রমিকদের জন্য ‘নিড বেইসড্ এডুকেশন’ ডিজাইন করা এখন সময়ের দাবি। এতে করে রেমিট্যান্স ফাইটাররা যেমন উপকৃত হবেন, তেমনি দেশও সমৃদ্ধি লাভ করবে। বাউবির কর্ম তৎপরতায় বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে।
বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণ বলা হয় তৈরি পোশাক-শিল্পকে। এই খাত দেশের সর্ববৃহৎ রপ্তানি আয়ের উৎস। লাখ লাখ মানুষের, বিশেষত নারীদের, কর্মসংস্থানের জোগানদাতা এ শিল্প। এই শ্রমিকদের লক্ষ্য করে বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে সদ্য প্রতিষ্ঠিত ‘আইটিভেট’ গার্মেন্টস টেকনোলজির উপর ছয় মাসের সার্টিফিকেট কোর্স চালু করতে পারে। পোশাক-শিল্পের ঊর্ধ্বতন পদের জন্য বিশেষত নারীদের যোগ্য করে গড়ে তোলাই হতে পারে এই কোর্সের মূল লক্ষ্য। নারী সমাজকে উপযুক্ত মর্যাদা দান করে দেশের কাজে লাগানোর ব্যাপারে শহিদ জিয়া ছিলেন অগ্রদূত। তিনি যথার্থই বলেছেন, ‘দুটি সবল হাত থাকলে কাজ যত সহজে করা যায় এক হাতে সে কাজ অসম্ভব হতে পারে। পুরুষ এবং মহিলা সমাজ দুটি হাতের মতন। দেশকে মনের মতো গড়তে হলে দুটি হাতেরই দরকার এবং দুটোই সবল হতে হবে।’
একটি পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রবাসীরা প্রায় ৩০.৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার দেশে পাঠিয়েছেন। এই বিশাল অর্জনের প্রায় পুরোটাই এসেছে আমাদের রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের হাড়ভাঙা শারীরিক শ্রম আর তপ্ত রোদে পুড়ে যাওয়া শরীর থেকে; কোনো মেধা, প্রযুক্তি বা কারিগরি দক্ষতার স্বীকৃতি হিসেবে নয়। কতদিন আর আমরা শুধু সংখ্যার পেছনে ছুটব? কতজন মানুষ বিদেশে গেল, তার চেয়েও বড় প্রশ্ন- কতটা মর্যাদা আর দক্ষতার সাথে তারা সেখানে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারছে?
সঙ্গত কারণেই ২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ অধিবেশনে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিশ্বমঞ্চে এক নতুন বাংলাদেশের আকুতি তুলে ধরেছেন। তিনি আমাদের এই অদম্য কর্মক্ষম তরুণদের শুধু সস্তা শ্রমে সীমাবদ্ধ না রেখে ‘দক্ষ মানবসম্পদ’- এ রূপান্তরের ডাক দিয়েছেন; চেয়েছেন প্রযুক্তি হস্তান্তর আর দক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমে বাংলাদেশকে একটি আত্মমর্যাদাশীল ‘উৎপাদনকেন্দ্র’ হিসেবে গড়ে তুলতে, যাতে কোনো প্রবাসীকে আর অবমূল্যায়িত শ্রমে নিজের রক্ত পানি করতে না হয়, বরং মেধা ও দক্ষতার পূর্ণমূল্যে বিশ্বজুড়ে গর্বের সাথে উজ্জ্বল হয়ে উঠে বাংলাদেশের নাম।
শ্রমবাজারকে সমৃদ্ধ করার সুদূর পরিকল্পনা গ্রহণের ক্ষেত্রে মাস্টাররোল প্লে করতে পারে বাউবি। আমার বিশ্বাস বাউবির পক্ষেই এটা সম্ভব। কারণ, দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের দোরগোড়ায় শিক্ষার অধিকার পৌঁছে দিতে বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির ১২টি আঞ্চলিক কেন্দ্র, ৮০টি উপাঞ্চলিক কেন্দ্র এবং ১৮৩৫টি স্টাডি সেন্টার কার্যকর ভূমিকা পালন করে চলেছে।
বর্তমান সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার হলো দক্ষতা উন্নয়ন, কর্মসংস্থানমুখী শিক্ষা, ফ্রিল্যান্সিং ও আউটসোর্সিং প্রশিক্ষণ, বিদেশি ভাষা শিক্ষা, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ক্ষমতায়ন ইত্যাদি। এসব লক্ষ্য বাস্তবায়নে উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় নিজস্ব (জনবল, অবকাঠামো) সক্ষমতা দিয়ে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। জেলা উপজেলা পর্যায়ে বিভিন্ন স্কিল কোর্স, প্রশিক্ষণ সম্প্রসারণ ও দক্ষতাভিত্তিক সনদ প্রদানের ক্ষেত্রেও বাউবির অবকাঠামো ইতোমধ্যে প্রস্তুত রয়েছে। দূরদর্শী ও অভিজ্ঞ নেতৃত্ব প্রদানের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠান ও বাস্তবতার সমন্বয় ঘটাতে পারলেই বাংলাদেশ তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারবে, আর সেক্ষেত্রে বাউবি হয়ে উঠবে নির্ভরতার প্রতীক। বাউবি নিজে উপকৃত হবে, পাশাপাশি অর্থনীতির চাকা সচল হবে, উপকৃত হবে জাতি, সমৃদ্ধ হবে গোটা দেশ।
লেখক: অধ্যাপক, গবেষক, সাবেক ট্রেজারার, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় ও উপাচার্য, পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।
সূত্র: নতুন আরএসএস সোর্স