|
| |
বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর, ২০২৬, ২০ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

স্বত্ব © ২০২৬ গণমাধ্যম। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।

সর্বশেষঃ

হালদার দুই পাড়ে ১ হাজার ২৯ প্রজাতির উদ্ভিদ শনাক্ত, ২৩টি বিপন্ন

গণমাধ্যম ডেক্স

গণমাধ্যম ডেক্স

প্রকাশ : ০৩ নভেম্বর, ২০২৬, ০৭:৪৬ পিএম
২৬৭ পঠিত
হালদার দুই পাড়ে ১ হাজার ২৯ প্রজাতির উদ্ভিদ শনাক্ত, ২৩টি বিপন্ন
যুক্ত থাকুন
সর্বশেষ খবরের জন্য ফলো করুন:
চট্টগ্রামের হালদা নদীর দুই পাড়ে ১ হাজার ২৯ প্রজাতির উদ্ভিদ শনাক্ত করেছেন গবেষকরা। এসব উদ্ভিদের মধ্যে ৫১৭টি ঔষধি, ২৩টি বিপন্ন এবং সংরক্ষণের উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে আরও ১০০টি প্রজাতি বিপন্ন হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) চট্টগ্রামে বেসরকারি সামাজিক উন্নয়ন ও গবেষণা সংস্থা ইফেক্টিভ ক্রিয়েশন...

চট্টগ্রামের হালদা নদীর দুই পাড়ে ১ হাজার ২৯ প্রজাতির উদ্ভিদ শনাক্ত করেছেন গবেষকরা। এসব উদ্ভিদের মধ্যে ৫১৭টি ঔষধি, ২৩টি বিপন্ন এবং সংরক্ষণের উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে আরও ১০০টি প্রজাতি বিপন্ন হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) চট্টগ্রামে বেসরকারি সামাজিক উন্নয়ন ও গবেষণা সংস্থা ইফেক্টিভ ক্রিয়েশন অন হিউম্যান ওপিনিয়ন (ইকো) আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়।

২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত গবেষণাটি পরিচালিত হয়। একই গবেষণায় নদীটির দূষণের জন্য ২৯টি উৎস চিহ্নিত করা হয়েছে। 

গবেষণায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ওমর ফারুক (রাসেল)। সহযোগী নেতৃত্বে ছিলেন ইকোর সায়েন্টিফিক অফিসার ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থীরা।

সার্বিক তত্ত্বাবধানে ছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক সভাপতি এবং মেহেরপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. শেখ বখতিয়ার উদ্দীন।

গবেষণায় হালদা নদীর দুই পাড়ে ১ হাজার ২৯ প্রজাতির উদ্ভিদ শনাক্ত করা হয়েছে। এসব উদ্ভিদ ৫৮৭টি গণ এবং ১৫২টি পরিবারের অন্তর্ভুক্ত। এর মধ্যে বড় বৃক্ষ ২১২ প্রজাতির, গুল্ম ১৩৩টি, লতা ১৩৩টি, বীরুৎ ৫২২টি এবং পরজীবী উদ্ভিদ ৯টি। এছাড়া ২টি নগ্নবীজি, ১৩টি মস গোত্রীয়, ৩৫টি ফার্ন এবং ৭ প্রজাতির ছত্রাক পাওয়া গেছে।

শনাক্ত হওয়া উদ্ভিদের মধ্যে ৭৬৫টি স্থানীয় এবং ২৪৪টি বিদেশি প্রজাতির। একবীজপত্রী উদ্ভিদ ২২৩টি এবং দ্বিবীজপত্রী ৭৪৯টি। দ্বিবীজপত্রী উদ্ভিদের মধ্যে ফ্যাবেসি গোত্রের এবং একবীজপত্রী উদ্ভিদের মধ্যে ধান ও ঘাসজাতীয় পোয়াসি গোত্রের প্রাধান্য পাওয়া গেছে।

গবেষণায় শনাক্ত উদ্ভিদের মধ্যে ৫১৭টি ঔষধি উদ্ভিদ রয়েছে। এসব উদ্ভিদের মধ্যে কুর্চি, বচ, আপাং, কালমেঘ, হিজল, ছাতিম, আকন্দ, হাতিশুঁড়, সোনালু ও স্বর্ণলতা উল্লেখযোগ্য। গবেষকদের মতে, এসব উদ্ভিদ শুধু নদীতীরের জীববৈচিত্র্যের অংশ নয়, ভবিষ্যতে ঔষধি উদ্ভিদ নিয়ে গবেষণার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ২৩টি বিপন্ন উদ্ভিদ প্রজাতি শনাক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে বাটনা, লেইস্যা গর্জন বা লেকুয়া গর্জন, চাউ তাল, ঈশ্বরমূল, নেরা মিলাতি, পাখা ঢেকিয়া, বনিপদ, মাইল্লা আম, পানিজাম ও চালমুগড়া উল্লেখযোগ্য। পাশাপাশি সংরক্ষণের উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে বিপন্ন হতে পারে এমন ১০০টি উদ্ভিদ প্রজাতি চিহ্নিত করেছেন গবেষকরা। এর মধ্যে নীল ভুট্টা, তেজবহুল, ফাইজ গাছ, সিধা জারুল, কুর্চি পাম, খনা, অশোক, বরুন ও লবঙ্গ লতা রয়েছে।

গবেষণায় প্রাকৃতিকভাবে মাছের প্রজননের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হালদা নদী দূষণের জন্য মোট ২৯টি উৎস চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে পানি দূষণের ১৩টি, বায়ু দূষণের ১০টি, মাটি দূষণের ১১টি, শব্দ দূষণের ৪টি, তাপীয় দূষণের ৪টি, ধূলি দূষণের ৫টি, ভারী ধাতু দূষণের ৬টি, প্লাস্টিক দূষণের ৩টি এবং ভূমিক্ষয়ের একটি উৎস শনাক্ত করা হয়েছে। একাধিক দূষণের ধরন একই উৎসের সঙ্গে সম্পর্কিত হওয়ায় এসব সংখ্যার যোগফল ২৯টির বেশি।

হালদা নদীর উদ্ভিদবৈচিত্র্য সংরক্ষণ, দূষণ নিয়ন্ত্রণ ও প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ১৩টি সুপারিশ করেছে ইকো। এর মধ্যে রয়েছে দুর্লভ ও বিপন্ন উদ্ভিদ সংরক্ষণ, নদীভাঙন রোধে স্থানীয় প্রজাতির উদ্ভিদ রোপণ, উদ্ভিদবৈচিত্র্য ও পানির গুণমান নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং নদীতীরবর্তী কৃষকদের জৈব পদ্ধতিতে চাষাবাদে উৎসাহিত করা।

এছাড়া কর্ণফুলী নদীর দূষণ নিয়ন্ত্রণ, নদী খননের মাটি নিরাপদ স্থানে অপসারণ, অবৈধ নদী দখল বন্ধ, প্লাস্টিক ও কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, শিল্পবর্জ্য শোধন, অপরিকল্পিত বসতি ও স্থাপনা নিয়ন্ত্রণ এবং নালা-ড্রেনের অপরিশোধিত পানি নদীতে ফেলা বন্ধের সুপারিশ করা হয়েছে।

অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ওমর ফারুক (রাসেল) বলেন, হালদা নদীকে আমরা মূলত মাছের প্রাকৃতিক প্রজননক্ষেত্র হিসেবে চিনি। কিন্তু এই নদীর দুই পাড়ে যে সমৃদ্ধ উদ্ভিদ বৈচিত্র্য রয়েছে, তা নিয়ে আগে পূর্ণাঙ্গ কোনো গবেষণা হয়নি। আমাদের গবেষণায় ১ হাজার ২৯ প্রজাতির উদ্ভিদ শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ৭২৯টি প্রজাতি হালদা নদী এলাকায় প্রথমবারের মতো নথিভুক্ত হয়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, এসব উদ্ভিদের মধ্যে ২৩টি বিপন্ন এবং আরও ১০০টি প্রজাতি ভবিষ্যতে বিপন্ন হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। পাশাপাশি ৫১৭টি ঔষধি উদ্ভিদের সন্ধান পাওয়া গেছে, যা ভবিষ্যতে গবেষণার নতুন সম্ভাবনা তৈরি করবে।

তিনি বলেন, হালদাকে শুধু মাছের প্রজননক্ষেত্র হিসেবে দেখলে হবে না, এর দুই পাড়ের উদ্ভিদ, জলজ প্রাণী, মাটি ও পানির সমন্বিত পরিবেশ রক্ষা করতে হবে। নদী দখল ও দূষণ বন্ধের পাশাপাশি বিপন্ন উদ্ভিদ সংরক্ষণ, দেশীয় প্রজাতির গাছ রোপণ, শিল্পবর্জ্য শোধন এবং নিয়মিত পানি ও উদ্ভিদ বৈচিত্র্য পর্যবেক্ষণ জরুরি। এ ক্ষেত্রে সরকারি সংস্থার পাশাপাশি স্থানীয় জনগণ, কৃষক, জেলে ও গবেষকদের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। আমরা চাই, এই গবেষণার তথ্য হালদা নদী সংরক্ষণের পরিকল্পনা ও নীতিনির্ধারণে কাজে লাগুক।

হালদা নদীর উদ্ভিদ বৈচিত্র্যে সংরক্ষণ, দূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং নদীর প্রাকৃতিক পরিবেশ পুনরুদ্ধারে জন্য পরিকল্পনা, কার্যকর আইন প্রয়োগ করা অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করেন গবেষকরা।

সূত্র: নতুন আরএসএস সোর্স