|
| |
রবিবার, ০৮ নভেম্বর, ২০২৬, ২৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

স্বত্ব © ২০২৬ গণমাধ্যম। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।

সর্বশেষঃ

৭৪ বছর বয়সেও পাঠকের কাছে পত্রিকা পৌঁছে দেন শেফালী পাল

গণমাধ্যম ডেক্স

গণমাধ্যম ডেক্স

প্রকাশ : ০৮ নভেম্বর, ২০২৬, ০৫:২৮ এএম
৩১৮ পঠিত
৭৪ বছর বয়সেও পাঠকের কাছে পত্রিকা পৌঁছে দেন শেফালী পাল
যুক্ত থাকুন
সর্বশেষ খবরের জন্য ফলো করুন:
বাবা পত্রিকা বিক্রি করতেন, পরে ছেলে করেছিল, এখন আমি করছি। জীবন যত দিন আছে, পা দুটোতে চলার শক্তি যত দিন থাকবে, পত্রিকা বিক্রি করে যাব।

সকালের আলো ফোটার আগেই শুরু হয় তাঁর দিনের ব্যস্ততা। হাতে পত্রিকার বান্ডিল নিয়ে এক দোকান থেকে অন্য দোকানে, কখনো অফিসে, কখনো পরিচিত পাঠকের বাড়িতে ছুটে চলেন তিনি। ২৫ বছর ধরে এভাবেই চলছে তাঁর জীবন।

গল্পটা শেফালী রুদ্র পালের (৭৪)। তিনি কক্সবাজারের ঈদগাঁও উপজেলার সদর ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের পালপাড়ার বাসিন্দা। ঈদগাঁওয়ের মানুষের কাছে তিনি পরিচিত ‘শেফালী মাসি’ নামে। অনেকেই তাঁকে ‘প্রিয় মাসি’ নামেও ডাকেন।

শেফালীর বাবা ছিলেন পত্রিকা বিক্রেতা। ছোটবেলা থেকেই বাবার হাত ধরে সংবাদপত্রের সঙ্গে পরিচয় তাঁর। পাঁচ বছর বয়সে স্কুলে ভর্তি হলেও আর্থিক সংকটে পঞ্চম শ্রেণির পর পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারেননি।

১৪ বছর বয়সে ১৯৬৬ সালে কক্সবাজার সদর উপজেলার খুরুশকুল ইউনিয়নের রুদ্রপাড়ার রবীন্দ্র রুদ্রর সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। স্বামী ছিলেন স্কুলশিক্ষক। কিন্তু বিয়ের মাত্র তিন বছরের মাথায় ১৯৬৯ সালে স্বামীর মৃত্যু হয়। এরপর দুই সন্তানকে নিয়ে বিপাকে পড়েন শেফালী। পরে অর্থসংকটে বাবার বাড়ি ঈদগাঁওয়ে ফিরে আসেন তিনি। তাঁর দুই সন্তানের একজন ছোট থাকতেই মারা যায়।

সংসারের দায়িত্ব সামলাতে প্রথমে হাসপাতালে জুনিয়র নার্সের কাজ নিয়েছিলেন শেফালী। তবে সেটি বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। এরপর ছাত্রছাত্রী পড়িয়ে নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে বড় করেন ছেলে স্বপন পালকে।

স্বপন পাল উচ্চমাধ্যমিক (এইচএসসি) পর্যন্ত পড়াশোনা করলেও অসুস্থতার কারণে আর এগোতে পারেননি। পরে বিয়ে করেন স্বপন। এক ছেলে ও এক মেয়ের বাবা হন তিনি। চাকরি না পেয়ে তিনিও যুক্ত হন পত্রিকা বিক্রির পেশায়। ঈদগাঁওয়ের বিভিন্ন এলাকায় পত্রিকা সরবরাহ করে চলছিল তাঁর সংসার।

শেফালীর বাবা ছিলেন পত্রিকা বিক্রেতা। ছোটবেলা থেকেই বাবার হাত ধরে সংবাদপত্রের সঙ্গে পরিচয় তাঁর। তাঁর ছেলেও পত্রিকা বিক্রি করতেন। ২০০১ সালে ছেলে অসুস্থ হয়ে পড়লে তিনি পত্রিকা বিক্রির দায়িত্ব নেন।

একসময় একমাত্র ছেলে স্বপনও অসুস্থ হয়ে পড়েন। ২০০১ সালের দিকে ছেলের হাতে থাকা পত্রিকা বিক্রির দায়িত্ব নেন শেফালী। এরপর ২০০৮ সালে ছেলে স্বপন পালকেও হারান তিনি। সেই থেকেই ছেলের বউ নাতি-নাতনিদের দায়িত্ব নিয়ে সংসার চালাচ্ছেন তিনি।

বিক্রি কমেছে, থামেননি শেফালী

স্মার্টফোন ও অনলাইন মাধ্যমের বিস্তারে ছাপা পত্রিকার চাহিদা কিছুটা কমেছে। সেই সঙ্গে শেফালীর আয়ও কমেছে। এখন প্রতিদিন পত্রিকা বিক্রি করে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা পান তিনি। এই সামান্য আয়েই তাঁর সংসার চলে।

চলতি বছর ৩১ অক্টোবর বিকেলে ঈদগাঁও বাসস্টেশনের একটি দোকানের সামনে বসে পত্রিকা বিক্রি করছিলেন শেফালী। সেখানে গিয়েই কথা হয় তাঁর সঙ্গে। এ সময় তাঁর কাছ থেকে যুব রেড ক্রিসেন্ট ঈদগাঁও উপজেলা টিম লিডার আজিজুর রহমানকে পত্রিকা কিনতে দেখা যায়।

জানতে চাইলে আজিজুর রহমান বলেন, শেফালী মাসি ইচ্ছা করলে অন্য কাজে মনোযোগী হয়ে বেশি টাকা আয় করতে পারতেন। কিন্তু বাবা এবং মারা যাওয়া সন্তানের স্মৃতি ধরে রাখতে তিনি ৭৪ বছর বয়সেও জাতীয় ও স্থানীয় দৈনিক পত্রিকা বিলি ও বিক্রি করে চলেছেন। এ জন্য গ্রাহকেরা তাঁকে সম্মান করেন। সাংবাদিকেরাও তাঁকে সমীহ করেন।

ঈদগাঁও প্রেসক্লাবের সভাপতি রেজাউল করিম বলেন, দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে শেফালী মাসিকে ঈদগাঁও এলাকায় পত্রিকা বিক্রি করতে দেখছেন তিনি। ঝড়বৃষ্টি উপেক্ষা করে তিনি অফিস-আদালত ও বাসাবাড়িতে পত্রিকা পৌঁছে দেন।

ঈদগাঁও আদর্শ শিক্ষা নিকেতনের সহকারী শিক্ষক নুরুল ইসলাম বলেন, ঈদগাঁওয়ে শেফালী রুদ্র পাল ছাড়া পত্রিকা বিক্রির অন্য কোনো হকার বা এজেন্ট নেই। তিনি নিজ উদ্যোগে পত্রিকা নিয়ে আসেন এবং নিজেই বিক্রি ও বিলি করেন।

কক্সবাজারের ঈদগাঁও বাসস্টেশনে একটি দোকানের সামনে বসে দৈনিক পত্রিকা বিক্রি করেন শেফালী রুদ্র পাল। সম্প্রতি তোলা

ঈদগাঁও যুব মানবিক ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান মুনির আহমদ বলেন, সকালে মাইক্রোবাস থেকে ঈদগাঁও স্টেশনে পত্রিকার বান্ডিল নামিয়ে দেওয়া হয়। সেখান থেকে শেফালী নিজেই বান্ডিল সংগ্রহ করে গ্রাহকদের বাড়িতে পৌঁছে দেন। বিকেলে অবশিষ্ট পত্রিকা নিয়ে বাসস্টেশন এলাকায় একটি দোকানের সামনে বসেন। সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরেন। কয়েক বছর ধরে শেফালীর এই বিরতিহীন সংগ্রাম দেখে তিনিও অবাক হন।

শেফালীকে সংবাদপত্র সরবরাহ করেন কক্সবাজার শহরের ‘খবর বিতান’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের মালিক মোহাম্মদ হাশিম। তিনি বলেন, বর্তমানে শেফালী প্রতিদিন সব মিলিয়ে ১০৫ কপি পত্রিকা বিক্রি করেন। প্রতিদিন প্রায় ৩৫০ টাকা কমিশন পান তিনি।

‘জীবন যত দিন আছে, পত্রিকা বিক্রি করে যাব’

এজেন্ট মোহাম্মদ হাশিম বলেন, ‘বার্ধক্য শেফালীকে থামিয়ে রাখতে পারেনি। কখনো হেঁটে হেঁটে, আবার কখনো স্টেশনে বসে পত্রিকা বিক্রি করেন তিনি। লেনদেনের ক্ষেত্রে অত্যন্ত সৎ ও স্বচ্ছ শেফালী। কখনো এক টাকাও বকেয়া রাখেননি। দুই দিন পরপর পত্রিকা বিক্রির টাকা বিকাশের মাধ্যমে পরিশোধ করেন।’

এত কষ্টের পরও শেফালীর মুখে প্রশান্তির হাসি। পত্রিকা বিক্রিতে সম্মান আছে বলে মনে করেন তিনি। তিনি জানান, সবাই তাঁকে সম্মান ও আদর-স্নেহ করেন, ভালোবাসেন। তাতেই তাঁর আনন্দ।

জানতে চাইলে শেফালী প্রথম আলোকে বলেন, ‘বাবা পত্রিকা বিক্রি করতেন, পরে ছেলে করেছিল, এখন আমি করছি। জীবন যত দিন আছে, পা দুটোতে চলার শক্তি যত দিন থাকবে, পত্রিকা বিক্রি করে যাব।’

সূত্র: প্রথম আলো