কী বলে যেতে পারলেন না তাহসিফ
গণমাধ্যম ডেক্স
নিখোঁজ হওয়ার এক দিন পর তুরাগ নদ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরির মরদেহ। তার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর নতুন করে আলোচনায় এসেছে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার দেশত্যাগের ভিডিও।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবি করা হচ্ছে, ওই ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার সঙ্গে জড়িত ছিলেন তাহসিফ। অথচ মৃত্যুর তিন মাস আট দিন আগে প্রকাশিত এক পডকাস্টে এ অভিযোগের পক্ষে প্রমাণের প্রশ্ন তুলেছিলেন তিনি নিজেই। বলেছিলেন, ‘যে ঘটনাগুলো ওই সময় ঘটেছিল, সবকিছু আমি বলব না। আমারও কিছু অপরাগতা আছে।’ তার সেই বক্তব্য এবং মৃত্যুর পর বন্ধুর করা রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার দাবি ঘিরে তৈরি হয়েছে নতুন আলোচনা। তবে ভিডিওটির সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা কিংবা মৃত্যুর সঙ্গে ওই ঘটনার কোনো যোগসূত্র এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত হয়নি।
পডকাস্টে কী বলেছিলেন তাহসিফ?
গত ২১ জুলাই ‘Speak With Rashid’ নামের ইউটিউব চ্যানেলে প্রকাশিত এক পডকাস্টে নিজের চাকরি, বিমানবাহিনীর অভিজ্ঞতা এবং তাকে নিয়ে প্রকাশিত সংবাদ প্রতিবেদন সম্পর্কে কথা বলেন তাহসিফ সাউরি। ওই প্রতিবেদনে তাকে ঘিরে যেসব অভিযোগ তোলা হয়েছিল, সেগুলোকে তিনি প্রোপাগান্ডা বলে অভিহিত করেন।
সাক্ষাৎকারের শেষ দিকে উপস্থাপক ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার দেশত্যাগের সময়কার ভিডিওর প্রসঙ্গ তোলেন। তাকে নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে ভিডিওটি ছড়িয়ে দেওয়ার যে অভিযোগ করা হয়েছিল, সে বিষয়ে তার ব্যাখ্যা জানতে চান।
জবাবে তাহসিফ বলেন, ‘ওখানে তারা ক্লিয়ারলি লিখেছে ভিডিওটি আমি ছড়িয়েছি। আমি যে শুট করেছি, এটাও তারা বলেনি। বলেছে, রিফাত আশরাফী ভিডিওটা করেছে এবং আমি ভিডিওটা নাকি ছড়িয়ে দিয়েছি। আমি যদি ভিডিওটা করেও থাকি, ছড়িয়েও থাকি, হোয়াট ইজ দ্য প্রুফ দে আর হ্যাভিং।’
তিনি আরও বলেন, ‘এটাও হতে পারে, এজন্য (এই অভিযোগের জন্য) আমি হয়তো আজকে এয়ারফোর্সে নেই।’
এরপর উপস্থাপক সরাসরি জানতে চান, শেখ হাসিনার দেশত্যাগের ভিডিও ধারণ ও ছড়িয়ে দেওয়ার কারণেই কি তাকে বিমানবাহিনী থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছিল?
জবাবে তাহসিফ বলেন, ‘হতে পারে। যে ঘটনাগুলো ওই সময় ঘটেছিল। সবকিছু আমি বলব না। আমারও কিছু অপরাগতা আছে। আমার মনে হয়, এই অভিযোগের কারণে তারা এই জিনিসটা করেছে।’
তার বক্তব্যে ভিডিওটি ধারণ বা ছড়িয়ে দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিতভাবে স্বীকার করা হয়নি। বরং তিনি অভিযোগের পক্ষে প্রমাণের প্রশ্ন তুলেছেন এবং ওই সময়ের কিছু ঘটনা নিয়ে বিস্তারিত বলতে অপারগতার কথা জানিয়েছেন।
মৃত্যুর পর বন্ধুর ফেসবুক পোস্টে নতুন দাবি
তাহসিফের মৃত্যুর পর তার বন্ধু হিসেবে পরিচয় দেওয়া বাংলাদেশ নৌবাহিনীতে কর্মরত কেএসএম ইনতিসার ইনজামাম (KSM Intisaar Inzimam) ফেসবুকে একটি পোস্ট দেন। সেখানে তিনি দাবি করেন, শেখ হাসিনার দেশত্যাগের ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার ঘটনার সঙ্গে তাহসিফের সম্পৃক্ততা ছিল এবং ওই ভিডিও প্রকাশের পর তাকে বিভিন্নভাবে হেয় করা হয়েছিল।
পোস্টে ইনতিসার লেখেন, ‘ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিফ সাউরি। হাসিনার ভিডিও ভাইরাল করার সঙ্গে জড়িত এই ছেলেটার লাশ আজকে তুরাগ নদীতে ভেসে আসছে।’
তিনি আরও লেখেন, তাহসিফ গত পরশু রাতে বাইরে যাওয়ার পর এ ঘটনা ঘটে। মরদেহের হাতে কাদা থাকার বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি মৃত্যুর কারণ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তার ভাষ্য, ব্যক্তিগত বিরোধ বা দুর্ঘটনার বিষয়টি স্পষ্টভাবে প্রমাণিত না হলে তিনি ঘটনাটিকে রাজনৈতিক বলে ধরে নেবেন।
তবে এটি তার ব্যক্তিগত ধারণা ও দাবি। মরদেহের হাতে কাদা থাকার তাৎপর্য কিংবা মৃত্যুর পেছনে রাজনৈতিক কোনো কারণ রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করার মতো কোনো তদন্ত-ফল বা আনুষ্ঠানিক তথ্য ওই পোস্টে উপস্থাপন করা হয়নি।
বন্ধুত্ব, আদর্শের অমিল ও চাকরিজীবনের প্রসঙ্গ
তাহসিফের সঙ্গে নিজের দীর্ঘদিনের পরিচয়ের কথাও পোস্টে তুলে ধরেন ইনতিসার। তিনি জানান, আদমজী কলেজে তাহসিফ তার বন্ধু ছিলেন। পরে বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমিতে ৭৯ বিএমএ-সমমানের কোর্সে তারা একসঙ্গে প্রশিক্ষণ নেন।
ইনতিসার লেখেন, তাদের জীবনদর্শনের মধ্যে বিস্তর পার্থক্য থাকলেও তিনি যখন বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলতেন, তাহসিফ তা চুপ করে শুনতেন।
তার দাবি, ৫ আগস্টের ভিডিও প্রকাশের পর তাহসিফকে বিভিন্ন বিষয়ে হেয় করা হয়েছিল। তার বিরুদ্ধে পুলিশি মামলা করা সম্ভব হয়নি বলেও পোস্টে উল্লেখ করেন তিনি। এসব ঘটনার সঙ্গে ভিডিওটি প্রকাশের যোগসূত্র রয়েছে বলে নিজের বিশ্বাসের কথা জানান ইনতিসার।
পোস্টে তিনি আরও দাবি করেন, ৫ আগস্টের ঘটনার আগে তাহসিফের সঙ্গে তার দেখা হয়েছিল এবং তখন তাহসিফ স্বাভাবিক দায়িত্ব পালন করছিলেন।
তবে বন্ধুর এসব বক্তব্যের স্বাধীন যাচাই পাওয়া যায়নি। একইভাবে, ভিডিও প্রকাশের কারণে তাহসিফকে হয়রানি করা হয়েছিল কি না, কিংবা তার চাকরি থেকে অবসরের সঙ্গে ওই ঘটনার কোনো সম্পর্ক ছিল কি না, তা নির্ধারণের জন্য প্রামাণ্য তথ্য প্রয়োজন।
তুরাগ নদ থেকে যেভাবে উদ্ধার হয় মরদেহ
নিখোঁজ হওয়ার এক দিন পর, গত ২৮ অক্টোবর বিকেলে ঢাকার উত্তরখানের রাজাবাড়ী ঘাটসংলগ্ন তুরাগ নদ থেকে তাহসিফের মরদেহ উদ্ধার করেন টঙ্গী নৌ পুলিশ ফাঁড়ির সদস্যরা। ২৯ অক্টোবর পুলিশ তার পরিচয় ও মরদেহ উদ্ধারের তথ্য নিশ্চিত করে।
নৌ পুলিশ সূত্রের বরাতে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ খবর পাওয়ার পর পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। মরদেহ উদ্ধারের পর সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে ময়নাতদন্তের জন্য শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়।
তবে তার মৃত্যুর প্রকৃত কারণ তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি। ময়নাতদন্ত ও তদন্তের ফল ছাড়া মৃত্যুর ধরন কিংবা এর পেছনে কারও সংশ্লিষ্টতা সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।
প্রশ্ন রয়ে গেছে, উত্তর মেলেনি
তাহসিফ সাউরির পডকাস্টের বক্তব্য, তার বন্ধুর ফেসবুক পোস্ট এবং মৃত্যুর পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া দাবিগুলো- সব মিলিয়ে ৫ আগস্টের ভিডিও নিয়ে পুরোনো বিতর্ক নতুন করে সামনে এসেছে।
তবে তিনটি বিষয় আলাদা করে দেখা জরুরি: ভিডিওটি কে ধারণ করেছিলেন, কে সেটি ছড়িয়ে দিয়েছিলেন এবং তাহসিফের মৃত্যুর সঙ্গে ওই ঘটনার কোনো সম্পর্ক আছে কি না। একটি বিষয়ে প্রচলিত দাবি অন্য বিষয়গুলোর সত্যতা প্রমাণ করে না।
পডকাস্টে তাহসিফ অভিযোগের পক্ষে প্রমাণের প্রশ্ন তুলেছিলেন এবং কিছু ঘটনা নিয়ে বিস্তারিত বলতে অপারগতার কথা জানিয়েছিলেন। তার মৃত্যুর পর সেই বক্তব্য নতুন করে আলোচনায় এলেও, তিনি ঠিক কোন ঘটনাগুলোর কথা বলতে চেয়েছিলেন, তা নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি।
এখন গুরুত্বপূর্ণ হলো, তার মৃত্যুর কারণ কী, নিখোঁজ হওয়ার আগে কী ঘটেছিল এবং ভিডিওসংক্রান্ত অভিযোগের পক্ষে কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ আছে কি না; এসব প্রশ্নের উত্তর তদন্ত ও প্রামাণ্য তথ্যের ভিত্তিতে পাওয়া। তার আগে মৃত্যুর সঙ্গে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা কিংবা ভিডিও প্রকাশের যোগসূত্রকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
সূত্র: কালবেলা